এই গল্পটি আমাদের দেখায় কষ্টের মধ্যে থাকা একজন তরুণের ধৈর্য, বিশ্বাস এবং সহানুভূতির মূল্য। ছোট্ট জাহিদ যে পাঁচ টাকার সাথে কীভাবে নিজের মানবিকতা এবং ধৈর্যকে মিলিয়েছে, তা আমাদের শেখায়—সঠিক মনোভাব এবং ভালো কাজের প্রতিদান দেরিতে হলেও আসে।
গল্পের নাম: শেষ পাঁচ টাকা।💸
নাম ছিলো তার জাহিদ।
জাহিদ শহরে পড়াশোনা করতো। বড় শহরের ভিড়, আলো, মানুষের দৌড়ঝাঁপ—সবকিছুর মাঝেই সে ছিলো একটু আলাদা। কারণ অন্যরা যেখানে স্বপ্ন দেখে আরামে বাঁচার, জাহিদের স্বপ্নটা ছিল খুব সাধারণ—ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ করা, আর একদিন বাবার কষ্টের বোঝা হালকা করা।
তার পরিবার ছিল গ্রামের একেবারে প্রান্তিক। বাবা গ্রামের ছোট্ট একটা দোকানে কাজ করতেন। দোকান বলতে আসলে একটা কাঠের চৌকি আর টিনের চাল—কখনো বেচাকেনা হয়, কখনো সারাদিন বসে থেকেও এক পয়সা আসে না। মাসের শেষে বাবার পাঠানো টাকাই ছিল জাহিদের একমাত্র ভরসা। সেই টাকায় চলত ভাড়া, খাওয়া, বই-খাতা—সবকিছু।
কিন্তু টাকা সবসময় সময়মতো আসত না। কখনো এক সপ্তাহ দেরি, কখনো পুরো মাসেই আসত না। ফোন করলে বাবা শুধু বলতেন,
“বাবা, একটু ধৈর্য ধর। চেষ্টা করছি।”
জাহিদ জানত, এই “চেষ্টা” শব্দটার ভেতরে কত রাত না-ঘুমানো, কত অপমান আর কত না-বলা কষ্ট লুকিয়ে থাকে।
তবুও জাহিদ কখনো অভিযোগ করেনি। নিজের মনে শুধু একটাই কথা বলত—
“কষ্ট যত বড়, ফল তত মিষ্টি।”
সেই দিনটাও ছিল তেমনই এক কঠিন দিন। সকাল থেকেই কিছু খাওয়া হয়নি। হোস্টেলের ডাইনিংয়ে বাকি জমে গেছে, তাই আজ আর খাবার দেবে না। পকেটে হাত ঢুকিয়ে গুনে দেখল—মাত্র পাঁচ টাকা।
পাঁচ টাকা মানে আজকের দিনে প্রায় কিছুই না। তবুও জাহিদ সেই পাঁচ টাকাটাকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখল। ভাবল, একটা বিস্কুট কিনলে হয়তো দুপুরটা কোনোভাবে পার করা যাবে। কিন্তু তারপরও সে লাইব্রেরির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
কারণ তার বিশ্বাস ছিল—জীবনে কিছু পেতে হলে কষ্ট সহ্য করতেই হয়। আজ না পড়লে, আজ না শিখলে—আগামীকাল আরেকটু পিছিয়ে পড়তে হবে।
লাইব্রেরির পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার চোখে পড়ল রাস্তার ধারে বসে থাকা এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক। গায়ে ময়লা কাপড়, চোখে অসহায় দৃষ্টি। মানুষজন পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে, কেউ তাকাচ্ছে না।
বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বলল,
“বাবা… একটু খাবার দিবি?”
জাহিদের পা থেমে গেল। বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিল। নিজের পেটের কথা মনে পড়ল, আবার বৃদ্ধের চোখের দিকেও তাকাতে পারছিল না।
পাঁচ টাকার কথা মনে পড়ল। এই টাকাটা দিলে আজ তার আর কিছুই থাকবে না। হয়তো সারাদিন না খেয়েই থাকতে হবে। কিন্তু তবুও সে ধীরে ধীরে পকেট থেকে পাঁচ টাকাটা বের করল।
এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। তারপর চুপচাপ বৃদ্ধের হাতে টাকাটা দিয়ে বলল,
“নিন দাদু, আমি পরে কিছু খেয়ে নেব।”
বৃদ্ধ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না। তারপর দুই হাত তুলে কাঁপা গলায় বলল,
“তুই সুখী হ, বাবা। তোর কষ্ট একদিন শেষ হবে। আল্লাহর উপর ভরসা রাখ।”
এই কথাগুলো জাহিদের বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে আটকে গেল।
সে কিছু না বলে আবার হাঁটতে শুরু করল। লাইব্রেরিতে ঢুকে অনেকক্ষণ পড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু ক্ষুধায় চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। তবুও সে বই বন্ধ করেনি। কারণ তার কাছে হার মানা মানে ছিল নিজের স্বপ্নের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।
সন্ধ্যায় হোস্টেলে ফিরল সে। শরীর ভীষণ ক্লান্ত, পেট একেবারে খালি। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বুঝল—আজ সত্যিই কিছু নেই।
তবুও আশ্চর্যভাবে তার মনে কোনো আফসোস ছিল না। বরং এক ধরনের শান্তি অনুভব করছিল। মনে হচ্ছিল, আজ সে ঠিক কাজটাই করেছে।
রাত নেমে এলো। হোস্টেলের বারান্দায় বসে সে আকাশের দিকে তাকাল। তারাদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বাবার কথা ভাবল। ভাবল মায়ের মুখ, গ্রামের সেই ছোট্ট ঘর, আর নিজের ফেলে আসা শৈশব।
ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। দরোয়ান এসে বলল,
“জাহিদ, তোর নামে একটা চিঠি এসেছে।”
চিঠিটা হাতে নিয়েই জাহিদের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। খাম খুলতেই চোখ ভিজে উঠল। ভেতরে বাবার পাঠানো টাকা। খুব বেশি না, কিন্তু আজকের জন্য যথেষ্ট।
আর সাথে ছিল একটা ছোট্ট চিরকুট।
চিরকুটে লেখা—
“বাবা, জানি তোর কষ্ট হচ্ছে। আমারও মন খারাপ লাগে।
কিন্তু সাহস হারাস না। আল্লাহ সব দেখেন।
তোর সময় আসবেই। তুই বড় হবি।
তোর কষ্টের দিন একদিন শেষ হবেই।”
জাহিদ চিঠিটা বুকে চেপে ধরল। চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু ঠোঁটে একটুখানি হাসি। মনে মনে বলল,
“আল্লাহ, আজ আমি বুঝলাম—ভালো কাজ করলে দেরি হলেও প্রতিদান মেলে।”
সেদিন রাতে সে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ল।
কিন্তু সেই ঘুমে ছিল না অভাবের হাহাকার।
ছিল পরিতৃপ্তি, ছিল বিশ্বাস, ছিল আশার আলো।
কারণ জাহিদ জানত—
কষ্ট চিরদিন থাকে না।
ধৈর্য আর বিশ্বাস থাকলে, একদিন না একদিন সুখের দরজাও খুলে যায়।
![]() |
