ছায়ার মতো জীবন" আমাদের এক সাধারণ মানুষের, রহিমের, নিঃশব্দ সংগ্রামের গল্প বলে। শহরের কোলাহল, মানুষের উদাসীনতা এবং ব্যক্তিগত কষ্টের ভেতরেও সে প্রতিদিন বেঁচে থাকে শুধু টিকে থাকার জন্য। এই গল্পে দেখা যায় কিভাবে দারিদ্র্য, হারানো সম্পর্ক এবং জীবনযাত্রার চাপ একজন মানুষকে নীরব ছায়ার মতো করে দেয়, কিন্তু অন্তরে আশার আলো কখনো নিভে যায় না। এটি একটি হৃদয়ছোঁয়া গল্প, যা আমাদের শেখায়—জীবন শুধু আনন্দ নয়, অনেক সময় কঠোর বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করেই মানুষ বড় হয়।
গল্পের নাম: ছায়ার মতো জীবন।🌑
নাম ছিলো তার, রহিম।
রহিমের বয়স ছিলো পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি। ঢাকার এক প্রান্তে ভাঙা টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট ঘরেই তার ঠিকানা। ভোর পাঁচটার আগেই তার দিন শুরু হয়। অ্যালার্মের দরকার হয় না—অভ্যাস আর দুশ্চিন্তাই তাকে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। অন্ধকার ভেদ করে সে রিকশা নিয়ে বের হয় 🚴। শহর তখনো পুরো জাগেনি, কিন্তু রহিমের জীবনে বিশ্রামের কোনো সময় নেই।
এক সময় তারও সংসার ছিল। স্ত্রী ছিল, ছোট একটা ছেলে ছিল। স্বপ্ন ছিল—ছেলেটাকে মানুষ করবে, পড়াশোনা শেখাবে, নিজের মতো করে বাঁচতে দেবে। কিন্তু অভাব ধীরে ধীরে সব গিলে খেয়েছে। টাকার টানাপোড়েন, অসুখ, ঝগড়া—একদিন স্ত্রী চলে গেল 💔। ছেলেটাকে নিয়ে শহরের আলোয় হারিয়ে গেল সে। তারপর থেকে আর কোনো খোঁজ নেই। ফোন নম্বর বদলে গেছে, ঠিকানাও অজানা।
গ্রামে রয়ে গেছে রহিমের বৃদ্ধ মা 🌾। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, চোখে ঝাপসা দেখা। মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়েই রহিম শহরে এসে পড়েছিল। ভেবেছিল কয়েক মাসে কিছু টাকা জমাবে, তারপর মাকে নিয়ে আসবে। কিন্তু মাস কেটে বছর হয়েছে, জীবনটা শুধু টিকে থাকার হিসাবেই আটকে গেছে।
রিকশা চালাতে চালাতে তার চোখে ঘুম আসে, হাতে ব্যথা ধরে। তবুও সে থামে না। কারণ থামলে ক্ষুধা দাঁড়িয়ে যায় দরজায়। দুপুরে অনেক সময় এক কাপ চা আর শুকনো বিস্কুটই তার খাবার। কোনো কোনো দিন সেটুকুও জোটে না।
একদিন বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে সে দাঁড়িয়েছিল রাস্তার এক চায়ের দোকানে। শরীরটা ক্লান্ত, মনটা আরও বেশি ভারী। পাশের একজন জিজ্ঞেস করেছিল,
— “ভাই, কিছু খাইছো?”
রহিম হালকা হাসি দিয়েছিল 🙂। সেই হাসির ভেতরে জমে ছিলো বহু বছরের কান্না।
— “না ভাই, ঘরে ভাত থাকলে তো এখানে দাঁড়াতাম না।” 🍚
কথাটা বলার পর সে আর কিছু বলেনি। কিন্তু সেই এক লাইনের ভেতর ছিল তার পুরো জীবন। কত না খেয়ে থাকা রাত, কত অপমান, কত অদেখা কষ্ট—সবকিছুর প্রতিধ্বনি।
রাতে ঘরে ফিরে পুরনো একটা ডায়েরি বের করল 📖। অনেক পাতা ফাঁকা, কিছু পাতা ভেজা, কিছুতে কালি ছড়ানো। সে লিখল—
“আমি বেঁচে আছি, শুধু টিকে আছি। আমার জীবনের গল্প কেউ পড়বে না। আমি কোনো নায়ক নই, আমি একজন নীরব ছায়া।”
পরদিন সকালে শহর আবার জেগে উঠল । মানুষ অফিসে যাচ্ছে, বাচ্চারা স্কুলে, কেউ স্বপ্নের পেছনে দৌড়াচ্ছে। আর রহিম? সে রিকশা নিয়ে আবার ছায়ার মতো ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। কেউ তার নাম জানে না, কেউ তার কষ্ট শোনে না।
রিকশা চালাতে চালাতে তার মনে পড়ে ছেলেটার কথা। ছোটবেলায় ছেলেটা তার রিকশার পেছনে বসে বলত, “বাবা, আমি বড় হয়ে অনেক বড় মানুষ হব।” আজ সেই ছেলে কোথায়? সে ভাবে—
“আমি কি কম কষ্ট করেছি? শুধু কি দারিদ্র্যই আমাকে বাবার মর্যাদা থেকে নামিয়ে দিল?”
কিন্তু কোনো উত্তর আসে না।
সন্ধ্যায় গ্রামে মাকে ফোন করে 📞। মায়ের কণ্ঠে ক্লান্তি, তবুও আশ্বাস।
— “বাবা, নিজের শরীরের খেয়াল রাখিস।”
রহিম শুধু “হ্যাঁ মা” বলে। সে জানে, নিজের কথা বললে মায়ের বুক আরও ভারী হবে। তাই চুপ করে থাকে।
রাত নামলে 🌙 শহরের আলো আরও উজ্জ্বল হয়। মানুষ হাসে, গল্প করে, কেউ রেস্টুরেন্টে যায়। আর রহিম ফেরে তার ভাঙা ঘরে 🛌। মশার কামড়, শরীরের ব্যথা, আর মাথার ভেতরের অশান্তি—এই তিনের সাথে যুদ্ধ করেই তার রাত কাটে।
ঘুম আসার আগে সে আকাশের দিকে তাকায় 🌌। দূরের তারাগুলো দেখে ভাবে—
“আমি আলো নই। আমি শুধু আলোয়ের নিচে পড়ে থাকা এক ছায়া।”
তার জীবন কারও গল্পে আসে না, খবরের কাগজে ছাপে না। তবুও সে প্রতিদিন বেঁচে থাকে। কারণ কোথাও একজন মা অপেক্ষা করে আছে, আর ভেতরের কোথাও এক ফোঁটা আশা এখনো নিভে যায়নি।
রহিম জানে, হয়তো তার জীবন বদলাবে না। কিন্তু যতদিন শ্বাস আছে, ততদিন সে ছায়ার মতো হলেও চলতে থাকবে। কারণ এই শহরে অনেক মানুষ আলোয় বাঁচে, আর অনেক মানুষ—রহিমের মতো—নীরবে ছায়া হয়ে জীবনটা বয়ে নিয়ে যায়।
![]() |
