জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও প্রিয়জনের জন্য সময় দেওয়া কত গুরুত্বপূর্ণ। কখনোই অভাব বা ব্যস্ততার কারণে বাবা-মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা ও সময় নষ্ট করা উচিত নয়। প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান এবং ক্ষণিকের অবহেলা চিরকালের আফসোস বয়ে আনতে পারে।
গল্পের নাম:শেষ চিঠি ।💌
রহিম ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছিলো। তার বাবা ছিলো একজন রিকশাচালক, মা অন্যের বাসায় কাজ করতো। প্রতিদিনের খাবার জোটানোও কষ্টসাধ্য ছিলো। কিন্তু একটাই স্বপ্ন ছিলো – ছেলে বড় হয়ে জীবনে কিছু করবে, বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে।
রহিমের মা-বাবা নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে শুধু তার পড়াশোনার জন্য জীবন দিয়েছিলেন। মা সারারাত কড়া পরিশ্রম করতেন, বাবা গরম রোদে রিকশা চালাতেন। প্রতিটি কষ্ট, প্রতিটি ত্যাগ ছিল শুধুই রহিমের ভবিষ্যতের জন্য।
রহিমও মেধাবী ছিল। ধাপে ধাপে সে এসএসসি, এইচএসসি পাস করল। স্বপ্নের শহরে গিয়ে ভালো চাকরি পেল। প্রথমদিকে সব কিছু ভালো লাগছিল – শহরের আলো, নতুন বন্ধু, অফিসের সুযোগ। কিন্তু ধীরে ধীরে চাকরি আর ব্যস্ততার মাঝে সে বাবা-মাকে ভুলে গেল।
মা প্রায়ই ফোন করতেন, ভয়ের সঙ্গে:
“বাবা, কবে আসবি? তোমার বাবার শরীর ভালো নেই।”
রহিম বলতেন:
“মা, খুব ব্যস্ত। অফিসের চাপ বেশি।”
মা ফোনের ওপারে চুপচাপ থাকতেন, কিছু বলতে পারতেন না, শুধু অপেক্ষা করতেন।
দিন, মাস, বছর কেটে গেল। রহিম গ্রামে ফিরে আসেনি। মা ফোন করা বন্ধ করে দিলেন। দিনশেষে শুধু একটি শূন্যতা ছিল, এবং কেবল চোখে অদ্ভুত এক নীরব কান্না।
একদিন ডাকপিয়নের হাতে রহিমের হাতে একটি চিঠি পৌঁছাল। চোখের সামনে সেই লাল-মাটির খাম খুলে দেখল। লেখা ছিল:
"ভাই, তোমার বাবা গত সপ্তাহে মারা গেছেন। শেষ সময়ে শুধু তোমাকেই খুঁজছিলেন। তোমার মা এখন
একা।"
চিঠির শেষে লেখা ছিল মায়ের শেষ কথা:
"বাবা, তোকে একবার দেখার আশাতেই এতদিন বেঁচে ছিলাম। এখন আর আসার দরকার নেই।"
রহিম তৎক্ষণাৎ গ্রামে গেল। কিন্তু বাবার কবর পাশে, মায়ের চোখ ফাঁকা। মুখে কোন অভিব্যক্তি নেই, শুধু নিঃশব্দ চুপচাপ। মা বললেন:
“তুই তো বড়লোক, অনেক ব্যস্ত। এখন আর কী দরকার এসে?”
সেদিন রহিম বুঝল – জীবন ছুটতে ছুটতে সে সব হারিয়েছে। বাবা-মা আর থাকবে না। আজ যদি সে সময় দিত, হয়তো এই আফসোস থাকত না।
রহিম বসে রীতিমতো কাঁদল। চোখ ভিজে গেল, হৃদয় নড়েচড়ে উঠল। বুঝল, ধন-সম্পদ, চাকরি, বন্ধুরা—
সবই গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু বাবা-মার জন্য সময় দেওয়া, তাদের সঙ্গ, তাদের ভালোবাসা সবচেয়ে মূল্যবান।
রহিম প্রতিজ্ঞা করল, বাকি জীবনে যেন কোনো সন্তানের সঙ্গে তার বাবা-মার মতো ভুল না হয়। জীবন যত
ব্যস্তই হোক, আসল সম্পর্ক ও ভালোবাসাকে কখনো পেছনে ফেলা যায় না।
শেষ চিঠি রহিমকে শিখিয়েছে – সময় আর সুযোগ হারিয়ে গেলে ফিরে আসে না। প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্ব দিতে হবে, আর প্রিয়জনের জন্য সময় দিতে হবে।
![]() |
