ঢাকা শহরটা বাইরে থেকে যতটা আলোঝলমলে দেখা যায়, ভেতরে ভেতরে ঠিক ততটাই কঠিন আর নির্দয়। এই শহরে প্রতিদিন হাজারো মানুষ স্বপ্ন নিয়ে আসে, আবার নীরবে সেই স্বপ্ন ভাঙার শব্দও চাপা পড়ে যায় শহরের কোলাহলে।
এই গল্প সেইসব মানুষের—যারা বছরে কয়েকটা মাস একটু স্বস্তিতে শ্বাস নিতে পারে, আর বাকি সময়টা কেবল টিকে থাকার লড়াই চালায়।
“তিন মাসের আলো, নয় মাসের অন্ধকার” ঠিক এমনই এক সংগ্রামী বাবার জীবনের গল্প, যেখানে ভালোবাসা আছে, দায়িত্ব আছে, কিন্তু সুযোগ খুব কম।
গল্পের নাম:টিকে থাকার হিসাব।
ঢাকার এক পুরোনো মহল্লায়, রেললাইনের খুব কাছে, একটা ছোট্ট ভাড়া বাসায় থাকে শামীম। বাসাটা আসলে বাসা বলার মতো কিছু না—দুটো ঘর, একটুখানি রান্নাঘর, আর টিনের ছাদের নিচে জমে থাকা গরম আর আর্দ্রতা। বর্ষাকালে ছাদের ফাঁক দিয়ে পানি পড়ে, শীতকালে বাতাস ঢুকে পড়ে ফাঁকা দেয়াল গলে। তবুও এই জায়গাটাই তার কাছে “ঘর”—কারণ এখানে তার স্ত্রী আছে, তার ছোট মেয়েটা আছে।
শামীমের জীবনে আলো আসে বছরে মাত্র তিন মাস।
ঈদের সময়, পূজোর সময়, আর বছরের শুরুর কিছুদিন। এই সময়টায় শহর ব্যস্ত হয়, মানুষ খরচ করে, ইভেন্ট হয়, সিজনাল কাজ বাড়ে। তখন শামীমের হাতে কিছু কাজ জোটে—কখনো ইভেন্টের মালামাল টানা, কখনো অস্থায়ী দোকানে কাজ, কখনো পরিচিত কারও ছোট ব্যবসায় হাত লাগানো।
এই তিন মাসে তার হাতে আসে সত্তর-আশি হাজার টাকা।
এই টাকাটা হাতে নিয়ে সে কয়েক রাত ঘুমাতে পারে না—কষ্টে না, আশায়।
ভাবতে থাকে, “এইবার হয়তো পারবো। এইবার একটু ভালো হবে।”
এই টাকায় প্রথমেই ঘরভাড়া দেয়।
তারপর আগের মাসের বাকি বিদ্যুৎ বিল।
তারপর বাজারের বাকি।
তারপর ধার।
একটার পর একটা টাকা কমতে থাকে।
হাতে গোনা নোটগুলো যেন ধীরে ধীরে গায়েব হয়ে যায়।
তবুও এই সময়টাতে তার ঘরে একটু হাসি ফিরে আসে।
তার স্ত্রী—নাসরিন—এই তিন মাসে কখনো কিছু চায় না।
চাওয়ার সাহস পায় না।
তবুও শামীম খেয়াল করে, বাজারের ব্যাগে একটু ভালো মাছ থাকলে নাসরিন আলাদা করে তাকায়।
মেয়েটার জন্য একটা নতুন জামা আনলে তার চোখে জল চলে আসে—খুশির জল।
এই তিন মাসে শামীম নিজেকে মানুষ মনে করে।
বাবা মনে করে।
স্বামী মনে করে।
কিন্তু তিন মাস শেষ হলেই শুরু হয় নয় মাসের অন্ধকার।
নয় মাস মানে—
প্রতিদিন সকালে হিসাব।
প্রতিদিন রাতে চাপা কষ্ট।
প্রতিদিন নিজের চোখের দিকে তাকাতে না পারা।
সকালবেলা শামীম ঘুম থেকে ওঠে খুব ভোরে।
কারণ দেরি করলে সুযোগ চলে যায়।
কোথাও যদি একদিনের কাজ পাওয়া যায়—লাইন ধরে দাঁড়াতে হয়।
কখনো কাজ মেলে, কখনো মেলে না।
কাজ না পেলে সে হেঁটে হেঁটে শহর ঘোরে।
মাঝে মাঝে ভাবে, ঢাকাটা এত বড় কেন?
এত বড় শহরেও কি তার জন্য কোনো ছোট জায়গা নেই?
তার মেয়েটা—মাইশা—প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার কথা বলে।
বন্ধুদের স্কুলের গল্প শোনায়।
নতুন বইয়ের ছবি আঁকে খাতায়।
শামীম চুপ করে শোনে।
মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
কিছু বলে না।
কারণ সে জানে, স্কুলের ফি দিতে পারবে না।
জানে, নতুন বই কেনা এখন বিলাসিতা।
জানে, তার মেয়েটার স্বপ্নের দাম এখন খুব বেশি।
একদিন মাইশা জিজ্ঞেস করেছিল,
“আব্বু, আমি কবে স্কুলে যাবো?”
সেই প্রশ্নের উত্তর শামীম এখনো খুঁজে পায়নি।
একবার সে ফুটপাথে একটা ছোট দোকান তুলেছিল।
প্লাস্টিকের ত্রিপল, দুটো কাঠের তাক, আর কিছু পণ্য।
ভেবেছিল, এবার বুঝি কিছু হবে।
নিজের কিছু হবে।
প্রথম কয়েকদিন ভালোই চলছিল।
মানুষ থামত, কিছু কিনত।
শামীম রাতে বাসায় ফিরে একটু শান্তি পেত।
কিন্তু এক সকালে সিটি কর্পোরেশনের লোকজন এলো।
কথা বলার সুযোগ দিল না।
দোকান ভেঙে দিল।
জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলল রাস্তায়।
শামীম দাঁড়িয়ে ছিল।
চুপচাপ।
কিছু বলার শক্তি ছিল না।
সেদিন সে শুধু দোকান হারায়নি।
হারিয়েছিল নিজের শেষ ভরসাটুকু।
বন্ধুরা ভাবে, ঢাকায় ভালোই আছে শামীম।
ফেসবুকে কখনো এক-আধটা ছবি দিলে সবাই বলে,
“ভাই, ভালোই আছো দেখছি!”
কেউ জানে না, সেই ছবির পর রাতে কী হয়।
কেউ জানে না, এক মুঠো চাল দিয়ে কীভাবে পুরো পরিবার বাঁচে।
কেউ জানে না, স্ত্রী চোখ নামিয়ে রাখে শুধু যেন কিছু চাইতে না হয়।
রাতে শামীম ছাদে উঠে দাঁড়ায়।
আকাশ দেখে।
শহরের আলো দেখে।
এই আলো কি তার জন্য?
নাকি সে শুধু এই আলোর নিচে হাঁটা এক অদৃশ্য মানুষ?
নয় মাস সে শুধু টিকে থাকে।
স্বপ্নগুলো একটু একটু করে খরচ করে ফেলে।
নিজেকে শক্ত রাখার অভিনয় করে।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে পড়ে।
তবুও সে হাল ছাড়ে না।
কারণ তার মেয়েটা আছে।
তার ভবিষ্যতের একটা ছোট আলো আছে।
সে বিশ্বাস করে, একদিন মাইশা স্কুলে যাবে।
একদিন এই নয় মাসের অন্ধকার কমে আসবে।
হয়তো সেই বিশ্বাসটাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে।
এই শহরে অনেক শামীম আছে।
তারা আলোয় দেখা যায় না।
কিন্তু শহরটা তাদের ঘাম আর স্বপ্ন দিয়েই দাঁড়িয়ে আছে।
তারা তিন মাস বাঁচে।
আর নয় মাস শুধু টিকে থাকে।
