ভালোবাসা সবসময় আনন্দ, মিলন বা একসাথে থাকার গল্প নয়।
কখনো কখনো ভালোবাসা হয়ে ওঠে নিঃশব্দ এক অপেক্ষা—যেখানে কেউ ফিরে আসে না, তবুও হৃদয় তার জন্যই ধুপধুপ করে।
বৃষ্টির শব্দে, বাতির আলোয়, ভেজা রাস্তায় কেউ একজন খোঁজে তাকে—যে আর কখনো ফিরবে না।
“অর্ণবের অপেক্ষা” এমন এক গল্প, যেখানে ভালোবাসা শেষ হয় না বিদায়ের সাথে, বরং আরও গভীর হয়ে জন্ম নেয় স্মৃতির ভেতরে।
এ গল্প সেইসব মানুষের জন্য, যারা কাউকে হারিয়েও তার অস্তিত্বকে ধরে রেখেছেন চোখের ভেজা পাতায়, বৃষ্টির সুরে, আর অন্তহীন অপেক্ষায়।
ভালোবাসা কি সত্যিই শেষ হয়?
নাকি শুধু মানুষটাই হারিয়ে যায়?
এ প্রশ্নের উত্তরই লুকিয়ে আছে অর্ণবের নীরব অপেক্ষায়…
গল্পের নাম:অর্ণবের অপেক্ষা।
শহরে বিকেলের পর থেকেই অদ্ভুত এক ভারী নীরবতা নেমে আসে।
আকাশ যেন কেঁদে ফেলতে চাইছে এমন ভঙ্গিমা। আর কিছুক্ষণ পরেই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি—মুখ ধোয়া, মন ভেজানো, স্মৃতি জাগানো বৃষ্টি।
রাস্তার বাতিগুলো বৃষ্টির ফোঁটায় ঝাপসা হয়ে সোনালি আলো ছড়াচ্ছে। সেই আলোয় ভিজে দাঁড়িয়ে আছে একাকী এক মানুষ—অর্ণব।
তার হাতে শক্ত করে ধরা একটি পুরোনো চিঠি।
চিঠিটা লিখেছিল অপর্ণা—অর্ণবের জীবনের একমাত্র প্রিয় মানুষ, যে তাকে ভালোবেসেও একদিন চলে গিয়েছিল।
চিঠিতে লিখা ছিল—
“অর্ণব, তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, কিন্তু আমি নিজের সাহস হারিয়ে ফেলেছিলাম।
তুমি আমাকে ধরে রাখতে চেয়েছিলে, অথচ আমি ভেবেছিলাম তোমার জীবনে আমিই বাধা হবো।
তুমি যখনই আমাকে মনে করবে, জেনে নিও তোমার নাম আমার মনেও কেঁপে উঠেছে।
কিন্তু এবার… তোমার আমার জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়।
ভালো থেকো। —অপর্ণা”
এই কয়েকটি লাইন অর্ণবের ভেতরটা ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।
তার পর থেকে প্রতিটি বৃষ্টির দিনে অর্ণবের মনে হতো—হয়তো অপর্ণা ফিরে আসবে।
হয়তো দরজায় কড়া নাড়বে।
হয়তো বলবে—
“অর্ণব, আমি ভুল করেছি… আমি ফিরে এসেছি।”
কিন্তু অপর্ণা আর কখনো ফিরল না।
দিন কেটে মাস, মাস কেটে বছর।
বন্ধুরা বলেছে—
“তুই ভুলে যা, জীবন থেমে থাকে না।”
কিন্তু অর্ণবের জীবন যেন ঠিক সেই জায়গায় আটকে ছিল, যেদিন অপর্ণা চলে গিয়েছিল।
তার চোখে প্রতিটি বৃষ্টি মানে অপর্ণার স্মৃতি।
তার জানালার পাশে ঝরে পড়া ফোঁটার শব্দ মানে অপর্ণার নাম।
একদিন বিকেলে, বৃষ্টি নেই, আকাশ শান্ত।
অর্ণব ফিরে এসে দেখে ডাকবাক্সে একটা নতুন খাম।
খামে লিখা—অপর্ণা।
হৃদপিণ্ড যেন থেমে গেল।
চিঠি খুলতেই আবার অপর্ণার হাতের লেখা—
**“অর্ণব, তুমি আমার জীবনের সবটুকু ভালোবাসা নিজের ভেতর জমিয়ে রেখেছিলে।
আমি জানি—তুমি এখনও জানালার পাশে বসে থাকো।
তুমি এখনও বৃষ্টির শব্দে আমাকে খুঁজে ফিরো।
কিন্তু আমি আর কখনো তোমার কাছে ফিরব না।
যদি কোনোদিন তোমার জানালার পাশে নীল রঙের ফুল ফুটে ওঠে,
জেনে নিও সেই দিনটাতেও তোমার কথা মনে পড়েছিল—
হয়তো দূর থেকে, হয়তো অন্য এক জীবন থেকে।
—অপর্ণা”**
চিঠিটা পড়ে অর্ণব প্রথমবার স্বীকার করল—
ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না,
শেষ হয় শুধু মানুষটা।
সেদিন রাতে বৃষ্টি নেমেছিল আবার।
অর্ণব রাস্তায় বেরিয়ে গেল।
বাতির নিচে দাঁড়িয়ে ভেজা রাস্তার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“অপর্ণা… আমি জানি তুমি ফিরবে না।
তবুও আমি অপেক্ষা করি।
কারণ আমার ভালোবাসার আরেক নামই হলো—অপেক্ষা।”
কয়েকদিন পর এক ভোরে অর্ণব জানালা খুলতেই দেখল—
জানালার নিচে ছোট্ট টবে ফুটে আছে একটি নীল ফুল।
বাতাসে দোল খাচ্ছে, বৃষ্টির ফোঁটায় চকচক করছে।
কখন ফুটল, কিভাবে ফুটল—অর্ণব জানত না।
কিন্তু তার মনে হলো—
এ ফুলটাই অপর্ণার শেষ উত্তর।
সে ফুলটিকে স্পর্শ করল না।
শুধু চুপ করে তাকিয়ে রইল।
কারণ কিছু স্মৃতি স্পর্শ করার নয়—
শুধু অনুভব করার।
বছর গড়াল আরও।
অর্ণব একটা নতুন অভ্যাস তৈরি করে নিল—
প্রতিটি বৃষ্টির রাতে জানালার পাশে বসে থাকা।
যদিও ভালোবাসা আর ফিরে আসবে না,
তবুও অপেক্ষার ভেতর তার জীবন একটা সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছে।
এখনও কেউ যদি তাকে জিজ্ঞেস করে—
“তুমি কি কাউকে ভালোবাসো?”
অর্ণব শুধু হাসে।
তার চোখে বৃষ্টির আলো ঝিলিক দেয়, আর সে আস্তে বলে—
“ভালোবাসা তো রয়ে গেছে…
মানুষটা চলে গেছে।”
শেষ কথা—
ভালোবাসার আসল রূপ কখনো পাওয়া নয়।
কখনো কখনো ভালোবাসা বেঁচে থাকে শুধু—
স্মৃতি, অপ্রাপ্তি আর অপেক্ষার ভেতরে।
অপর্ণা চলে গিয়েছিল,
কিন্তু অর্ণবের ভালোবাসা থেকে গিয়েছিল—
অপেক্ষার রূপে।
![]() |

Woo
উত্তরমুছুন