কিছু অপেক্ষা সময়ের সাথে শেষ হয় না, বরং সময় পেরিয়ে অপেক্ষাই হয়ে ওঠে জীবনের শেষ আশ্রয়।
“পুরনো লাল চেয়ার” এমনই এক গল্প—যেখানে মা–ছেলের সম্পর্ক, নিঃশব্দ অপেক্ষা আর অপূর্ণ ফিরে আসার যন্ত্রণা ধীরে ধীরে হৃদয়ে দাগ কাটে। এই গল্প পড়তে পড়তে হয়তো আপনি বুঝবেন, ভালোবাসা সব সময় শব্দে নয়, অনেক সময় অভ্যাস আর অপেক্ষার মধ্যেই বেঁচে থাকে।
গল্পের নাম: পুরনো লাল চেয়ার।
তিনি ছিলেন গীতা বেগম।
বয়স হয়েছিলো প্রায় সত্তরের কাছাকাছি।
থাকতেন দেশের এক প্রান্তিক গ্রামে—নামটা খুব বেশি পরিচিত নয়, তবে শান্ত। চারদিকে খোলা মাঠ, দূরে তালগাছ, আর বিকেলের বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ। এই গ্রামেই গীতা বেগম তাঁর জীবনের প্রায় সবটুকু সময় কাটিয়ে দিয়েছিলেন।
এক সময় তাঁর সংসার ছিলো।
স্বামী ছিলো, ছেলে ছিলো, হাসি ছিলো।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই একে একে কমে গেছে। স্বামী অনেক বছর আগেই মারা গিয়েছিলেন। এরপর থেকে তাঁর একমাত্র অবলম্বন ছিলো ছেলে—রবিন।
রবিন বড় হয়েছিলো এই গ্রামেই। উঠোনে দৌড়াতো, পুকুরে সাঁতার কাটতো, আর সন্ধ্যায় মায়ের পাশে বসে গল্প শুনতো। কিন্তু পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর সে শহরে চলে গিয়েছিলো। প্রথম দিকে নিয়মিত ফোন করতো, চিঠি দিতো। তারপর ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমে গেল। এক সময় একেবারেই থেমে গেল।
তবুও গীতা বেগম আশা ছাড়েননি।
তিনি বিশ্বাস করতেন—“ছেলে মানেই ফিরে আসবে।”
গীতার ঘরের এক কোণে রাখা ছিলো একটি পুরোনো লাল রঙের কাঠের চেয়ার। রঙ অনেক জায়গায় উঠে গেছে, কাঠে ফাটল ধরেছে, তবুও চেয়ারটা তিনি কখনো ফেলে দেননি। কারণ ওই চেয়ারটাতেই রবিন বসে পড়াশোনা করতো। ওই চেয়ারেই বসে সে স্বপ্নের কথা বলতো।
প্রতিদিন সকাল হলেই গীতা বেগম সেই চেয়ারটা একটু পরিষ্কার করতেন।
তারপর ধীরে ধীরে বসতেন।
চেয়ারে বসে উঠোনের দিকে তাকিয়ে থাকতেন দীর্ঘ সময়। কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলতেন—
“আজ না এলে কাল আসবে… ছেলে কি আর মাকে ভুলে থাকতে পারে?”
দুপুর হলে রান্না শুরু করতেন।
অভ্যাসের বশে নয়—বিশ্বাসের বশে।
ভাত বসাতেন দুইজনের জন্য। তরকারি হতো দুই ভাগে। এক প্লেট নিজের সামনে রাখতেন, আরেকটা প্লেট রাখতেন সেই লাল চেয়ারের পাশে।
খাওয়ার সময় তিনি একাই বসতেন।
অন্য প্লেটটা ঠান্ডা হয়ে যেত।
তবুও তিনি তুলে নিতেন না। মনে মনে ভাবতেন—“হঠাৎ যদি এসে পড়ে?”
গ্রামের মানুষ এসব দেখতো। কেউ কিছু বলতো না। কেউ চোখ মুছতো। কেউ মাথা নাড়তো। কিন্তু গীতা বেগম কারো কথায় কান দিতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিলো—এই অপেক্ষা বৃথা হবে না।
রাতে শোবার আগে তিনি পুরোনো খাতাটা বের করতেন।
খাতার পাতায় পাতায় লেখা ছিলো রবিনের নাম।
চিঠি লিখতেন—কিন্তু পাঠাতেন না।
“আজ তোর জন্য ভাত রেখেছিলাম।
আজও আসলি না।
কাল নিশ্চয়ই আসবি…”
এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিলো।
মাস পেরিয়ে বছর হলো।
কিন্তু গীতার অপেক্ষা পুরোনো হয়নি।
একদিন দুপুরের দিকে ডাকঘরের লোক এলেন। হাতে একটা পুরোনো খাম। খামটা দেখে গীতা বেগমের বুক ধড়ফড় করে উঠলো। এতদিন পর ছেলের কোনো খবর!
কাঁপা হাতে খাম খুললেন।
ভেতরে মাত্র এক লাইনের চিঠি—
“মা, আমি আসতে পারলাম না… আমাকে ক্ষমা করো…” 💔
এই এক লাইনে যেন পুরো পৃথিবী ভেঙে পড়লো তাঁর ওপর।
তিনি বসে পড়লেন।
চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরলেন।
কান্না এল না।
চিৎকার এল না।
শুধু গভীর একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো।
সেদিন তিনি রান্না করেননি।
ফাঁকা প্লেটটা চেয়ারের পাশে রেখেই উঠে গেলেন।
রাতে আলো জ্বালাননি।
পরের দিন সকালে সূর্যের আলো উঠোন ভরিয়ে দিল।
পাখিরা ডাকলো।
কিন্তু গীতা বেগম আর উঠলেন না।
গ্রামের লোকজন এসে দেখলো—
তিনি তাঁর প্রিয় লাল চেয়ারে বসে আছেন।
চোখ বন্ধ।
মুখে হালকা হাসি।
পাশে রাখা সেই ফাঁকা প্লেট।
সেদিন থেকে বাড়িটা তালাবদ্ধ।
কিন্তু উঠোনে পড়ে আছে সেই পুরোনো লাল চেয়ার।
চেয়ারটা এখনো রোদে ভিজে।
বৃষ্টিতে ভিজে।
নীরবে অপেক্ষা করে।
ঠিক যেমন করে গীতা বেগম প্রতিদিন অপেক্ষা করতেন—
একটা সন্তানের জন্য,
