কিছু সম্পর্ক শেষ হয় কথা দিয়ে, আর কিছু শেষ হয় নীরবতায়।
এই গল্পটি তেমনই এক নীরব ভালোবাসার—যেখানে বিদায় আসে কোনো ঝগড়া ছাড়াই, কোনো অভিযোগ ছাড়াই।
একটা ছোট্ট চিঠি, মাত্র দুটি শব্দ, আর তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক অসমাপ্ত সম্পর্কের গল্পই আপনাকে নিয়ে যাবে এই লেখার গভীরে।
যদি কখনো কাউকে হারিয়ে থেকেও অপেক্ষা করে থাকেন, তাহলে এই গল্প আপনাকে ছুঁয়ে যাবেই।
গল্পের নাম: একটা চিঠি এসেছিলো। 💌
সন্ধ্যেটা ছিল অস্বাভাবিক রকম শান্ত।
আকাশে তখন নরম কমলা আলো, বারান্দার রেলিংয়ে বসে থাকা পাখিগুলো ধীরে ধীরে উড়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময়েই দরজার নিচ দিয়ে একটা পুরোনো পোস্টকার্ড ঢুকে পড়লো। কাগজটা একটু হলদেটে, কোণাগুলো ভাঙা। দেখে বোঝা যায়, অনেক দূর পেরিয়ে এসেছে।
তিথি প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছিল, হয়তো কোনো বিজ্ঞাপন বা ভুল ঠিকানার চিঠি। কিন্তু কার্ডটা হাতে নিতেই বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা কাঁপুনি উঠলো।
খাম নেই।
স্ট্যাম্প নেই ঠিকঠাক।
আর ভেতরে লেখা—মাত্র দুটি শব্দ।
“ভালো থেকো।”
এই দুই শব্দেই তিথির চোখ আটকে গেল।
কোনো নাম নেই। কোনো পরিচয় নেই। তবুও সে জানতো—এই লেখা অনিকের।
কারণ অনিক কখনো বড় কথা লিখতো না।
সে সবসময় ছোট বাক্যে গভীর কথা বলে দিত।
একসময় তারা দু’জন মিলে কত স্বপ্ন বুনেছিল। সেই স্বপ্নগুলো খুব বড় কিছু ছিল না, তবুও তিথির কাছে ছিল সম্পূর্ণ। তারা ভাবতো, শহরের কোনো এক কোণে একটা ছোট্ট বাসা হবে। বড় কিছু নয়—দুটো ঘর, একটা রান্নাঘর আর একটা ছোট বারান্দা। বারান্দায় থাকবে একটা তুলসী গাছ 🌿। প্রতিদিন সন্ধ্যায় দু’জনে পাশাপাশি বসে চা খাবে। কথা কম, নীরবতা বেশি—তবুও অদ্ভুত শান্তি।
তিথি বিশ্বাস করতো, সুখ আসলে এমনই হয়।
চুপচাপ, শব্দহীন।
কিন্তু ঠিক এক বছর আগে অনিক বদলে যেতে শুরু করলো।
শুরুটা ছিল খুব ধীরে। ফোনে আর আগের মতো লম্বা কথা হতো না। “পরে বলছি”—এই কথাটা বেড়ে গেল। চোখে আর আগের উষ্ণতা থাকতো না। হাসলেও সেই হাসির ভেতরে যেন কিছু একটা অনুপস্থিত থাকতো।
তিথি বুঝেছিল, কিছু একটা ভুল হচ্ছে।
কিন্তু সে প্রশ্ন করেনি।
ভালোবাসার মানুষকে বিশ্বাস করতে চেয়েছিল।
তারপর একদিন অনিক আর ফোন ধরলো না।
একদিন নয়—অনেক দিন।
কোনো ঝগড়া হয়নি।
কোনো অভিযোগ ছিল না।
শুধু নীরবভাবে সে হারিয়ে গেল।
তিথি প্রথম কয়েক মাস ভেবেছিল, হয়তো ফিরে আসবে। মানুষ তো কখনো কখনো হারিয়ে যায়, আবার ঠিকই ফিরে আসে। সে প্রতিদিন অনিকের পুরোনো মেসেজগুলো পড়তো। রাতে ঘুমানোর আগে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকতো—যেন হঠাৎ করে একটা কল আসবে।
রাত এগারোটা বাজলেই সেই অপেক্ষা শুরু হতো। ⏰
এই সময়েই অনিক আগে ফোন করতো।
এখন সে জানে, ফোন আসবে না।
তবুও হাত থামে না।
ভালোবাসা কখনো যুক্তি মানে না।
একতরফা হলেও, সে অনুভব তবুও বাঁচিয়ে রাখে মানুষকে।
চিঠিটা হাতে নিয়ে তিথি অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। তার চোখ ভিজে উঠেছিল, কিন্তু কান্না আসেনি। কারণ এই দুই শব্দে কোনো অনুরোধ নেই, কোনো ফিরে আসার ইঙ্গিত নেই। শুধু একটা শেষ বিদায়ের মতো অনুভূতি।
সে ধীরে ধীরে ডায়েরিটা খুললো। সেই ডায়েরির পাতায় এখনও অনিকের নাম লেখা আছে। অনেক পুরোনো স্মৃতির মাঝে যত্ন করে চিঠিটা আটকে রাখলো।
এই চিঠিই এখন তার কাছে অনিকের শেষ উপস্থিতি।
কোনো ছবি নেই।
কোনো কণ্ঠস্বর নেই।
শুধু দুটি শব্দ—যেন বলে দেয়, কেউ একসময় ছিল, ভালোবেসেছিল, আর চলে গিয়েছিল।
তিথি জানে, এই গল্পের কোনো পূর্ণতা নেই।
কিন্তু কিছু গল্প পূর্ণতার জন্য হয় না।
কিছু গল্প শুধু থেকে যায়—নীরব সত্য হয়ে।
আর সেই সব গল্পের মাঝেই, একটা ছোট্ট পোস্টকার্ড আজও বলে যায়—
![]() |
