মায়ের ভালোবাসার কোনো হিসাব হয় না, কোনো দামও নেই। একজন মা নিজের স্বপ্ন, সুখ এমনকি জীবনের শেষ সম্বলটুকুও সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য হাসিমুখে বিসর্জন দিতে পারেন। এই গল্পটি ঠিক তেমনই এক মায়ের—যার নিঃশব্দ আত্মত্যাগে বেঁচে থাকে একটি সন্তানের স্বপ্ন। এটি শুধু নীলার গল্প নয়, এটি হাজারো গরিব মায়ের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি, যারা কিছু না বলেই সন্তানের জন্য সবকিছু দিয়ে দেন।
গল্পের নাম:মায়ের চোখের নীরব কান্না।
নীলা তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। বয়স কম হলেও তার চোখে ছিলো অনেক বড় স্বপ্ন। সে শুধু ভালো ছাত্রী হতে চায়নি, সে একদিন ডাক্তার হতে চেয়েছিলো। সাদা অ্যাপ্রোন পরে মানুষের সেবা করবে—এই স্বপ্নটাই তাকে প্রতিদিন পড়ার টেবিলে বসতে বাধ্য করতো। কিন্তু স্বপ্ন যত বড়ই হোক, বাস্তবতা ছিলো ভীষণ কঠিন।
নীলার পরিবার ছিলো ভীষণ সাধারণ। বাবা একজন দিনমজুর। কখনো কাজ থাকে, কখনো থাকে না। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। মা গৃহকর্মী। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের বাড়িতে কাজ করে, বাসন মাজে, ঘর ঝাড়ু দেয়, মেঝে মোছে। দিনের শেষে শরীরটা আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে চায় না, তবুও মুখে একটুও অভিযোগ নেই।
সংসারে অভাব ছিলো নিত্যসঙ্গী। অনেক দিন ঠিকমতো বাজার হতো না। অনেক সময় নীলার পড়ার খাতায় নতুন পৃষ্ঠা কিনে দিতে পারতেন না বাবা-মা। তবুও তারা কখনো নীলাকে বুঝতে দেননি যে তারা অসহায়। মা সব সময় বলতেন,
“পড়াশোনা কর মা, আল্লাহ একদিন সব ঠিক করে দেবেন।”
একদিন স্কুলে বিজ্ঞান ক্লাস শেষে হেডমাস্টার নীলাকে ডেকে নিলেন। তিনি নীলার খাতা দেখেছিলেন, পরীক্ষার খাতা দেখেছিলেন। মেয়েটার চোখে স্বপ্ন আর মেধা—দুটোই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি নীলাকে বললেন,
“নীলা, তুমি যদি সত্যিই ডাক্তার হতে চাও, তাহলে এখন থেকেই গাইড বই আর প্রাইভেট পড়া দরকার। সামনে অনেক বড় প্রতিযোগিতা। প্রস্তুতি শুরু করতে হবে এখনই।”
হেডমাস্টারের কথাগুলো নীলার মনে গভীরভাবে গেঁথে গেলো। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পুরো পথটায় তার মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছিলো—এই সব টাকা আসবে কোথা থেকে?
সেদিন বাড়ি ফিরে নীলা মাকে সব খুলে বললো। গাইড বই, কোচিং, প্রাইভেট পড়া—সবকিছু। বলতে বলতে তার গলা ধরে এলো। সে জানতো, এই কথাগুলো বলা মানেই মায়ের কষ্ট বাড়িয়ে দেওয়া।
মা তখন চুলায় ভাত বসাচ্ছিলেন। নীলার কথা শুনে তিনি চুপ করে রইলেন। একদম চুপ। কয়েক মুহূর্তের সেই নীরবতা নীলার কাছে ভীষণ ভারী মনে হলো। সে ভয় পেয়ে গেলো—হয়তো মা না করে দেবেন।
কিন্তু মা কিছু বললেন না। ধীরে ধীরে চুলা থেকে সরে এসে নীলার কপালে একটা চুমু দিলেন। তারপর খুব শান্ত গলায় শুধু বললেন,
“চিন্তা করিস না মা, আমি কিছু একটা করবো।”
এই “কিছু একটা করবো”—এই কথাটার ভেতরে কতটা ভার ছিলো, কতটা আত্মত্যাগ লুকিয়ে ছিলো, তা নীলা তখন বুঝতে পারেনি।
পরের তিন দিন মা অদ্ভুত রকম চুপচাপ ছিলেন। হাসতেন, কাজ করতেন, কিন্তু চোখে যেন অন্যরকম একটা ভাব ছিলো। নীলা কিছু জিজ্ঞেস করলেও মা শুধু বলতেন,
“কিছু না মা, তুই পড়াশোনা কর।”
তিন দিন পর এক সকালে মা খুব যত্ন করে আলমারির ভেতর থেকে একটা পুরোনো কাপড়ের পুঁটলি বের করলেন। সেই পুঁটলির ভেতর ছিলো তার জীবনের শেষ স্মৃতি—বিয়ের সময় পাওয়া এক জোড়া সোনার বালা। এই বালাগুলো তিনি কখনো পরতেন না, কিন্তু যত্ন করে রেখেছিলেন। কারণ এই বালাগুলোর সাথে জড়িয়ে ছিলো তার নতুন জীবনের শুরু, স্বপ্ন, ভালোবাসা।
মা সেই বালাগুলো হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। চোখের কোণে পানি জমে উঠলো, কিন্তু তিনি কাঁদলেন না। তারপর দৃঢ় হাতে বালাগুলো পুঁটলিতে বেঁধে বেরিয়ে পড়লেন।
জুয়েলার্স দোকানে ঢোকার সময় তার বুকটা কেঁপে উঠেছিলো। দোকানদার যখন বালাগুলো হাতে নিয়ে দাম বললো, তখন মায়ের চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিলো। তবুও তিনি চোখের পানি গিলে নিয়ে বললেন,
“ঠিক আছে, দিয়ে দিন।”
সেই টাকা দিয়ে মা নীলার জন্য কোচিং ফি দিলেন, গাইড বই কিনে দিলেন, প্রয়োজনীয় খাতা-কলম কিনে দিলেন। সবকিছু বাড়িতে এনে খুব সাধারণ ভঙ্গিতে নীলার হাতে তুলে দিলেন।
নীলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“মা, এত টাকা এলো কোথা থেকে?”
মা হেসে বললেন,
“আল্লাহর রহমত মা।”
নীলা তখনো জানত না, এই টাকার পেছনে মায়ের বুক ফাটা কান্না, স্মৃতি বিসর্জন আর নিঃশব্দ আত্মত্যাগ লুকিয়ে আছে।
দিন যেতে লাগলো। নীলা পড়াশোনায় আরও মন দিলো। কোচিংয়ে গিয়ে সে বুঝতে পারলো—মা তার জন্য কত বড় কিছু করেছেন। একদিন হঠাৎ সে মায়ের আলমারিতে গিয়ে দেখলো—সেই পুরোনো পুঁটলি খালি পড়ে আছে। তখনই সবকিছু তার মাথায় ঢুকে গেলো।
সেদিন রাতে নীলা মায়ের কোলে মাথা রেখে নিঃশব্দে কেঁদেছিলো।
মা কিছু জিজ্ঞেস করেননি। শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন,
“কাঁদিস না মা, পড়াশোনা কর।”
নীলা তখন বুঝেছিলো—মায়েরা কখনো নিজের ত্যাগের কথা বলেন না। তারা শুধু সন্তানের ভবিষ্যৎটাই দেখেন।
আজ নীলা অনেক বড় হয়েছে। জীবনের অনেক ধাপ পেরিয়েছে। কিন্তু আজও মা কখনো বলেননি,
“আমি তোমার জন্য কী করেছিলাম।”
বরং আজও তিনি একই কথা বলেন—
![]() |
