মানুষের জীবন সবসময় একরকম থাকে না। কখনো আলো, কখনো অন্ধকার—এই দুইয়ের মাঝখান দিয়েই আমাদের পথ চলা। অনেক সময় অজান্তেই আমরা এমন পথে পা বাড়াই, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন মনে হয়। ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল সঙ্গ আর ক্ষণিকের মোহ ধীরে ধীরে মানুষকে তার নিজের কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে নেয়। কিন্তু সব অন্ধকারের মাঝেও যদি অনুশোচনার আলো জ্বলে ওঠে, যদি ফিরে আসার ইচ্ছেটুকু বেঁচে থাকে—তাহলে হারিয়ে যাওয়া জীবনও আবার নতুন করে শুরু হতে পারে।
এই গল্প শুধু একজন ছেলের গল্প নয়, এটি হাজারো তরুণের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি। এটি ভুল, অনুশোচনা, ভাঙা বিশ্বাস আর আবার নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলার গল্প। যে গল্প আমাদের শেখায়—পথ যত ভুলই হোক, ফিরে আসার সাহস থাকলে জীবন আবার সুন্দর হতে পারে।
গল্পের নাম: ফিরে আসা।
সোহেল ছিলো ছোট শহরের এক সাধারণ ছেলে। শহরের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটি টিনের ঘর, সামনে কাঁচা উঠান আর পাশে বাবার ছোট মুদির দোকান—এই নিয়েই ছিলো তার পুরো পৃথিবী। খুব বড় স্বপ্ন না থাকলেও তার জীবনে ছিলো এক ধরনের স্বচ্ছ শান্তি, যেটা সে তখন বুঝতো না। সে ভাবতো, এটাই স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু সময় তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল—এই সাধারণ জীবনটাই ছিলো তার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
প্রতিদিন ভোরে ফজরের আজানের শব্দে তার ঘুম ভাঙতো। মা ধীরে ধীরে দরজায় এসে ডাক দিতেন,
“সোহেল, বাবা… নামাজের সময় হয়েছে।”
ঘুম জড়ানো চোখে সে উঠে অজু করতো, নামাজ পড়তো। নামাজ শেষে বাবার দোকানে গিয়ে ঝাড়ু দিতো, তাক গুছিয়ে দিতো, মাঝে মাঝে খদ্দেরদের জিনিসপত্র এগিয়ে দিতো। বাবা সন্তুষ্ট চোখে তাকিয়ে বলতেন,
“আল্লাহ তোকে ভালো মানুষ করুক বাবা।”
মা রান্নাঘরে কাজ করতে করতে ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতেন। সেই হাসির মধ্যে ছিলো অগাধ বিশ্বাস, নিঃশর্ত ভালোবাসা। সোহেল তখন বুঝতো না, এই হাসিই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড়
আফসোস হয়ে দাঁড়াবে।
বাবা-মায়ের কাছে সোহেল সবসময়ই দায়িত্বশীল ও ভালো ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিলো। পাড়া-প্রতিবেশীরাও বলতো,
“ছেলেটা খুব ভদ্র, নিশ্চয়ই একদিন মানুষ হবে।”
এই কথাগুলো শুনে বাবা গর্বে বুক ফুলিয়ে ফেলতেন।
কিন্তু কলেজে পড়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সোহেলের জীবন ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করলো। নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধু, নিজের মতো করে চলার স্বাধীনতা—সবকিছু তাকে ভেতরে ভেতরে বদলে দিচ্ছিলো। প্রথম দিকে সে নিজেও বুঝতে পারেনি, এই পরিবর্তন ভালো না খারাপ।
কলেজের কিছু বন্ধু ছিলো, যারা নিয়ম-কানুন মানাকে দুর্বলতা মনে করতো। তারা বলতো,
“এত নামাজ-কালাম করে কী হবে?”
“একটু মজা না করলে জীবনটা উপভোগ করা যায়?”
সোহেল প্রথমে এসব কথা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলো। কিন্তু ধীরে ধীরে সে তাদের সাথে মিশে গেলো। মোবাইল ফোনটা হয়ে উঠলো তার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, অপ্রয়োজনীয় ভিডিও দেখা, খারাপ কনটেন্ট—এসব তার মনটাকে ধীরে ধীরে বিষিয়ে তুললো।
তারপর এলো নেশা। শুরুটা ছিলো কৌতূহল থেকে, “একবার করলে কীই বা হবে?”
কিন্তু সেই একবারই তাকে ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে টেনে নিলো।
শুরুর দিকে কেউ বুঝতে পারতো না। সোহেল নিজেও সচেতন ছিলো না, কতোটা দূরে সে চলে গেছে। সে ভাবতো, সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণেই আছে। কিন্তু বাস্তবে সে নিজের জীবনটার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিলো প্রতিদিন একটু একটু করে।
একদিন তার টাকার দরকার হলো। খুব বড় দরকার না, কিন্তু সেই সময় তার কাছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিলো। বাবার দোকানে বসে সে চারপাশে তাকালো। কেউ নেই। ক্যাশবাক্সটা তার চোখে পড়লো।
হাত বাড়াতে তার বুক ধড়ফড় করছিলো।
মনে হচ্ছিলো, এই কাজটা করলে সে আর আগের সোহেল থাকবে না।
তবুও সে হাত বাড়ালো…
কয়েকটা নোট তুলে নিলো।
সেদিন সে শুধু বাবার দোকান থেকে টাকা চুরি করলো না—সে নিজের আত্মসম্মান, নিজের শিকড়, নিজের পরিচয়কেও চুরি করলো।
মা সবকিছু বুঝে গিয়েছিলেন। হয়তো টাকার অঙ্ক দেখে না, কিন্তু ছেলের চোখের ভাষা দেখে। সেদিন সন্ধ্যায় সোহেল দেখলো, মা চুপচাপ বসে আছেন। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। কোনো অভিযোগ নেই, কোনো কথা নেই—শুধু নীরব কান্না।
এই নীরবতা সোহেলের বুকের ভেতর আগুন লাগিয়ে দিলো।
মা কিছু বললেন না।
কিন্তু সেই চোখজোড়া যেন বলছিলো,
“আমি তোকে এমন করে মানুষ করিনি বাবা।”
সেই রাতে সোহেল ছাদে উঠে একা বসে রইলো। আকাশে চাঁদ, চারদিকে নিস্তব্ধতা। নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে সে নিজেকে প্রশ্ন করলো,
“এই কি আমি সেই সোহেল?
যে একদিন মায়ের মুখে হাসি আনতো?
এই কি সেই ছেলে, যাকে বাবা গর্ব করে নিজের সন্তান বলতো?”
চোখ বেয়ে অজান্তেই পানি গড়িয়ে পড়লো।
সেই মুহূর্তে তার ভেতরে এক গভীর তাড়া জন্ম নিলো—ফিরে আসার তাড়া, নিজেকে বদলানোর তাড়া।
পরদিন সকালে সে বাবা-মায়ের সামনে দাঁড়ালো। মাথা নিচু, গলা কাঁপছে।
“আব্বা… আমি ভুল করেছি। আমি বদলাতে চাই।”
বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর ধীরে ধীরে ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন। কোনো বকা নেই, কোনো অপমান নেই—শুধু নিঃশব্দ ভালোবাসা। 💖
এই আলিঙ্গনই সোহেলের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলো।
সেদিন থেকেই তার যুদ্ধ শুরু হলো। নেশা ছাড়াটা সহজ ছিলো না। অনেক রাত সে ঘুমাতে পারেনি, অনেক দিন শরীর কেঁপে উঠেছে। পুরনো বন্ধুদের ফোন সে উপেক্ষা করলো। একা একা লড়াই করলো নিজের সাথে।
সে আবার নামাজে ফিরলো। প্রতিটি সেজদায় সে কাঁদলো। পড়াশোনায় মন দিলো। বাবার দোকানে আগের মতোই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলো। মায়ের মুখে হাসি ফেরাতে তার দিন-রাত এক হয়ে গেলো।
ধীরে ধীরে তার জীবনে শান্তি ফিরে এলো।
যে শান্তি সে একদিন হারিয়ে ফেলেছিলো, আজ তা আরও দৃঢ় হয়ে ফিরে এলো।
দুই বছর পর, সোহেল এখন সমাজকর্মী হিসেবে কাজ করছে। নেশাগ্রস্ত তরুণদের পাশে দাঁড়ায়। তাদের বলে—
“আমি এই অন্ধকারে ছিলাম। আমি ফিরেছি। তুমিও পারবে।”
কারণ সে জানে—অন্ধকার যত গভীরই হোক, ফিরে আসার পথ সবসময় থাকে। 🌟
এই গল্প আমাদের দেখায়, মানুষ ভুল করতে পারে।
কিন্তু ভুল বুঝে পরিবর্তনের সাহস থাকলে, ফিরে আসা কখনোই অসম্ভব নয়।
![]() |
