এই পৃথিবীতে সবকিছু টাকা দিয়ে কেনা যায় না—কিছু জিনিস আছে যা মানুষকে সত্যিকার অর্থে বড় করে তোলে। সততা ঠিক তেমনই এক গুণ। এই গল্পটি রহিম নামের এক সাধারণ দিনমজুরের, যার জীবনে কোনো বিলাসিতা ছিল না, ছিল শুধু কঠোর পরিশ্রম আর সৎ মন। অভাবের মাঝেও যে মানুষ নিজের নীতিকে আঁকড়ে ধরে রাখে, তার জীবন একদিন না একদিন বদলাতে বাধ্য—এই গল্প তারই জীবন্ত প্রমাণ।
গল্পের নাম: সততার প্রতিদান। 🥀
রহিম ছিলেন একজন গরিব দিনমজুর।
প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি বেরিয়ে পড়তেন কাজের খোঁজে। কখনো ইট টানতেন, কখনো মাটি কাটতেন, আবার কোনো দিন কাজই জুটত না। রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে কষ্ট করে যে কয়টা টাকা পেতেন, তা দিয়েই কোনোমতে চলত সংসার। জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না, কিন্তু তার হৃদয় ছিল
পরিষ্কার—সততাই ছিল তার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
একদিন দুপুরের দিকে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটি মানিব্যাগ তার চোখে পড়ে। রহিম তুলে নিয়ে খুলে দেখেন—ভিতরে অনেক টাকা, আর সঙ্গে একটি কার্ড, যেখানে একজন ভদ্রলোকের নাম ও ঠিকানা লেখা। মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। এই টাকায় কতদিনের অভাব মিটে যেতে পারে—এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই আসে।
চারপাশে কয়েকজন মানুষ জড়ো হয়ে বলতে লাগল,
“রহিম ভাই, এই টাকা রেখে দাও। আল্লাহ নিজেই তোমার জন্য পাঠিয়েছে। তোমার জীবনটাই বদলে যাবে!”
রহিম একটু চুপ করে থাকলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“জীবন বদলায় ঘামের দামে আর সততায়। অন্যের কষ্টের টাকায় নয়।”
তার কণ্ঠে কোনো অহংকার ছিল না, ছিল দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি জানতেন—একবার ভুল পথে পা রাখলে নিজের চোখের দিকে আর তাকানো যায় না।
সিদ্ধান্ত নিয়ে রহিম ঠিকানার দিকে রওনা হলেন। অনেক দূরের পথ, ক্লান্ত শরীর, তবু মন ছিল শান্ত। ভদ্রলোকের বাড়িতে পৌঁছে দরজায় কড়া নাড়তেই এক মধ্যবয়স্ক মানুষ বেরিয়ে এলেন। রহিম বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “স্যার, রাস্তায় আপনার মানিব্যাগটি পেয়েছিলাম। আপনাকেই ফেরত দিতে এসেছি।”
ভদ্রলোক প্রথমে অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন। তারপর ব্যাগ খুলে দেখলেন—এক টাকাও কম নেই। তার চোখ ভিজে উঠল। তিনি বললেন,
“এই সময়ে এমন সততা খুব কম দেখা যায়। সবাই হলে টাকাটা নিজের করে নিত।”
রহিম মাথা নিচু করে শুধু বললেন,
“এটা আমার নয় স্যার। তাই ফেরত দেওয়াই ঠিক।”
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
“তোমার মতো মানুষকে আমি খুঁজছিলাম। তুমি কি আমার অফিসে কাজ করবে?”
রহিম যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। লজ্জায়, কৃতজ্ঞতায় চোখ নামিয়ে তিনি সম্মতি দিলেন। সেই
দিন থেকেই তার জীবনে নতুন এক অধ্যায় শুরু হলো।
দিন যেতে লাগল। রহিম অফিসে কাজ করতেন মন দিয়ে। সময়ের আগে আসা, দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করা, কারও সঙ্গে মিথ্যা না বলা—এসব গুণে তিনি ধীরে ধীরে সবার আস্থা অর্জন করলেন। কেউ জানত না, এই মানুষটা একসময় প্রতিদিনের খাবার নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতেন।
একদিন অফিসের সবাইকে ডেকে মালিক ঘোষণা করলেন,
“আজ থেকে রহিম আমার সহকারী। কারণ সততা আর বিশ্বাস ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান বড় হয় না।”
যে মানুষটা একসময় দিনমজুর ছিল, আজ সে সম্মানের জায়গায়। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে রহিম আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসেন। তার মনে হয়—সব কষ্টই যেন আজ সার্থক।
গ্রামের মানুষ আজও তার গল্প বলে। শিশুরা তার নাম শুনে শেখে—সত্য আর সততা কখনো হারিয়ে যায় না। রহিম জানেন, সম্পদ আসে-যায়, কিন্তু সততা থাকলে মানুষ কখনো ছোট হয় না।
![]() |
📖 গল্প থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায়।
এই গল্প আমাদের শেখায়—
