কিছু গল্প পড়া হয় না, অনুভব করা হয়। কিছু গল্প শব্দ হয়ে চোখের সামনে আসে না, বুকের ভেতর নীরবে নেমে যায়। “ফিরে কেউ আসে না” ঠিক তেমনই এক গল্প—যেখানে কোনো বড় ঘটনা নেই, নেই নাটকীয় মোড়; আছে শুধু আমাদের চেনা অবহেলা, দেরি করে ফেরা আর আর-কখনো-না-পাওয়ার হাহাকার।
এই গল্পটা সেইসব মানুষের জন্য, যারা ভেবেছিল—“পরে সময় হবে”, “কাল কথা বলবো”, “আরেকদিন দেখা যাবে।”
ভূমিকাটা পড়ে যদি বুকের কোথাও অজানা একটা খচখচানি শুরু হয়, যদি মনে হয় কাউকে এখনই ফোন দিতে ইচ্ছে করছে—তাহলেই বুঝবে, এই গল্পটা পড়া দরকার। কারণ কিছু গল্প শেষ হওয়ার আগেই আমাদের অনেক দেরি হয়ে যায়।
গল্পের নাম: ফিরে কেউ আসে না।💔
রায়হান অনেকদিন পর গ্রামের বাড়িতে ফিরলো। শহরের কংক্রিট দেয়াল, ব্যস্ত রাস্তাঘাট, মিটিং আর ডেডলাইনের ভিড় পেরিয়ে যখন সে গ্রামের শেষ মাথার কাঁচা রাস্তায় পা রাখল, তখন তার মনে হলো—এই পথটা যেন তাকে চিনে ফেলেছে। বাতাসে ভেসে আসছিল ভেজা মাটির গন্ধ, দূরে তাল গাছগুলো ধীরে ধীরে দুলছিল, আর উঠোনের পুকুরটা নিঃশব্দে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে, তবু কোথাও একটা অদ্ভুত শূন্যতা। যেন পুরো গ্রামটা তার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে, আবার কথা বলতেও পারছে না।
রায়হান বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে পড়লো। ছোটবেলার কত স্মৃতি এই উঠোনে—মায়ের ডাক, ভাতের হাঁড়ির গন্ধ, বিকেলের রোদে বসে পড়াশোনা, আর রাতে মায়ের পাশে শুয়ে গল্প শোনা। কিন্তু আজ উঠোনটা চুপচাপ। খুব বেশি চুপচাপ। দরজার সামনে এগিয়ে গিয়ে সে হঠাৎ থমকে গেল। দরজায় ভারী তালা ঝুলছে। বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা আশঙ্কা ঢুকে পড়লো।
পাশের বাড়ির চাচাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, — “চাচা, দরজায় তালা কেন?”
চাচার চোখ এড়িয়ে গেল, গলা কেঁপে উঠলো। — “তুই… জানিস না রে?”
রায়হানের বুকটা ধক করে উঠলো। — “কী জানবো, চাচা?”
চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, — “তোর মা মারা গেছে এক বছর হলো। তোকে খবর দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি। ফোন বন্ধ, ঠিকানা নেই… তোকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।”
এক মুহূর্তে চারপাশটা ঘুরে গেল রায়হানের। শব্দগুলো কানে ঢুকেও যেন মাথায় পৌঁছালো না। মা… মারা গেছে? এক বছর? অথচ সে জানেই না? বুকের ভেতর হাহাকার করে উঠলো। পা দুটো অবশ হয়ে এলো, সে উঠোনের মাঝখানে বসে পড়লো। তার মনে পড়লো—কতবার মা ফোন করেছিল, আর সে কতবার বলেছিল, “মা, এখন খুব ব্যস্ত, পরে কথা বলবো।”
শহরের জীবন তাকে সব দিয়েছিল—ভালো চাকরি, প্রমোশন, সম্মান। কিন্তু সেই জীবনের ভিড়ে সে বুঝতেই পারেনি, ধীরে ধীরে সে তার মাকে হারিয়ে ফেলছে। মায়ের ফোন অনেকদিন ধরেই বন্ধ পাওয়া যেত। সে ভেবেছিল, হয়তো ফোন নষ্ট, হয়তো নেটওয়ার্ক নেই। সত্যি বলতে, খোঁজ নেওয়ার মতো গুরুত্বই সে দেয়নি।
চাচা তালা খুলে দিলেন। রায়হান ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকলো। ঘরটা অচেনা লাগছে, অথচ সবকিছু চেনা। দেয়ালে ঝোলানো পুরনো ঘড়িটা থেমে আছে, রান্নাঘরের চুলায় ধুলো জমে গেছে, আর খাটটার পাশে পড়ে আছে মায়ের স্যান্ডেল—এক জোড়া, জীর্ণ, বহুদিন না পরা। বুকটা আবার কেঁপে উঠলো।
এক কোণে তাকিয়ে তার চোখে পড়লো মায়ের পুরনো চশমাটা। কাচে ধুলো জমে আছে, ফ্রেমটা একটু বেঁকে গেছে। সে হাত বাড়িয়ে চশমাটা তুললো। এই চশমা পরেই মা তাকে পড়তে বসাতেন, ভুল করলে মৃদু হেসে বলতেন, “আস্তে পড় বাবা, দুনিয়া কোথাও পালাচ্ছে না।” আজ সেই কণ্ঠস্বর শুধু স্মৃতিতে।
রায়হান পাশের ছোট ড্রয়ারটা খুললো। ভেতরে একটা পুরনো খাতা। ধুলোমাখা পাতাগুলো উল্টাতে গিয়ে তার চোখ আটকে গেল মায়ের হাতের লেখায়। কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লেখা—
“আজ রায়হান ফোন করলো না। জানি, ও খুব ব্যস্ত। তবুও বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা লাগে। হয়তো আর বেশি দিন নেই। শুধু একবার মুখটা দেখতে ইচ্ছে করে।”
আরেক পাতায় লেখা— “আজ শরীরটা খুব খারাপ। ডাক্তার যেতে বলেছে। রায়হানকে ফোন দিলাম, ধরলো না। পরে আবার চেষ্টা করবো।”
পাতার পর পাতা। প্রতিটা লাইনে অপেক্ষা, প্রতিটা শব্দে একা হয়ে যাওয়ার কষ্ট। রায়হানের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। সে মেঝেতে বসে পড়লো। এই ঘরে মা একা একা অসুস্থ হয়েছেন, একা কেঁদেছেন, একা অপেক্ষা করেছেন—আর সে ছিল শহরে, নিজের ব্যস্ততার রাজ্যে।
মনে পড়লো, কতবার মা বলেছিলেন— “বাবা, পরে কথা বলিস না রে, এখন একটু শোন।”
আর সে প্রতিবারই বলেছে— “মা, এখন পারছি না, পরে বলবো।”
আজ সেই ‘পরে’ শব্দটা তার বুকের ভেতর বিষের মতো ঢুকে যাচ্ছে। এখন আর পরে নেই। এখন আর ফোন আসবে না। এখন আর কেউ বলবে না, “বাবা, ভাত খেয়েছিস তো?”
রায়হান হাহাকার করে কাঁদতে লাগলো। এই কান্না শুধু মাকে হারানোর নয়, নিজের অবহেলার জন্য, নিজের দেরির জন্য, নিজের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য। সে বুঝতে পারলো—মানুষ সময়ের অভাবে নয়, গুরুত্বের অভাবে দূরে সরে যায়। ভালোবাসা অপেক্ষা করতে করতে একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তারপর নিঃশব্দে চলে যায়।
বাইরে সন্ধ্যা নামছে। উঠোনে বাতাস বয়ে যাচ্ছে, তাল গাছগুলো আগের মতোই দুলছে। সবকিছু আছে, শুধু মা নেই। রায়হান জানে—কিছু দেরি এমন হয়, যার আর কোনো ক্ষমা নেই। কিছু ফেরা এমন হয়, যেখানে কেউ আর অপেক্ষা করে না।
কারণ… ফিরে কেউ আসে না।
![]() |
