কখনও কখনও জীবনে এমন মুহূর্ত আসে, যেখানে চোখের দেখা আর হয় না, কিন্তু হৃদয় সবকিছু মনে রাখে। ছোট্ট ঘটনা, নীরব অপেক্ষা বা এক চিরন্তন স্পর্শ—সবই মানুষের মনে দাগ কাটে। এই গল্পটি সেইসব নীরব অনুভূতির গল্প, যেখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু বলার ভাষা নেই। প্রতিটি মুহূর্তে হৃদয় কেঁপে ওঠে, এবং প্রতিটি হারানো চোখের দেখা যেন চুপচাপ এক কষ্টের গান গায়। পড়তে থাকলে বোঝা যাবে, কখনো নীরবতা কথার চেয়ে গভীর হতে পারে, আর হারানো মুহূর্তগুলো কখনো ফিরে আসে না।
গল্পের নাম:চোখে চোখ না পড়া।😅
প্রতিদিন বিকেল ঠিক পাঁচটা দশ মিনিটে ছেলেটা এসে দাঁড়ায়। জায়গাটা শহরের এক ব্যস্ত বাসস্ট্যান্ড—চারপাশে হর্নের শব্দ, মানুষের হাঁকডাক, ধুলো আর তাড়াহুড়ো। কিন্তু এই সব কোলাহলের মাঝেও সে যেন একেবারে আলাদা। হাতে কোনো ব্যাগ নেই, কাঁধে কোনো দায় নেই, চোখে নেই কোনো গন্তব্যের তাড়া। সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে।
কেন দাঁড়িয়ে থাকে—এটা কেউ জানে না। কেউ জানতে চায়ও না।
প্রথমদিকে কেউ কেউ ভেবেছিল, হয়তো সে কারও জন্য অপেক্ষা করছে। পরে সবাই বুঝে গেছে, এই অপেক্ষা সাধারণ অপেক্ষা নয়। এটা এমন এক অপেক্ষা, যার শেষ নেই, যার জবাব নেই।
বাসস্ট্যান্ডে প্রতিদিন অসংখ্য বাস আসে যায়। কেউ নামে, কেউ ওঠে। কিন্তু একটি বাস এলেই ছেলেটার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। সে খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে, কিন্তু চোখ দুটো আপনাআপনি খুঁজে ফেরে পরিচিত এক মুখ।
বাসটা থামে। দরজা খুলে যায়। ভিড়ের ভেতর থেকে মেয়েটা উঠে আসে। প্রতিদিনের মতোই।
তার পরনে সাদামাটা পোশাক, কাঁধে একটা ছোট ব্যাগ। কানে হেডফোন 🎧। সে সোজা হেঁটে বাসে ওঠে, জানালার পাশের সিটে বসে পড়ে। চোখ থাকে সামনের দিকে। কখনোই ডানদিকে তাকায় না—যেখানে ছেলেটা দাঁড়িয়ে থাকে।
ছেলেটা জানে, সে তাকায় না। তবুও প্রতিদিন তাকিয়ে থাকে।
কারণ সে বিশ্বাস করে—কিছু অনুভূতি চোখে চোখ না পড়লেও বোঝা যায়।
প্রথম দিন সে ভেবেছিল, কাকতালীয়। দ্বিতীয় দিন মনে হয়েছে, অভ্যাস। তৃতীয় দিন থেকে অপেক্ষা। তারপর ধীরে ধীরে এই কয়েক সেকেন্ডের দেখা না-হওয়াই হয়ে উঠেছে তার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
ছেলেটা কখনো সামনে এগিয়ে যায়নি। কখনো হাত নেড়ে ডাকেনি। কখনো শব্দ করে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়নি। তার মনে হয়েছে—এই নীরবতাটাই হয়তো সবচেয়ে নিরাপদ।
সে ভয় পেত, যদি সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, যদি চোখে চোখ পড়ে যায়—আর মেয়েটার চোখে যদি বিরক্তি থাকে?
ভয় পেত, যদি এই একতরফা অনুভূতিটুকুও ভেঙে যায়।
এভাবে দিন যায়। সপ্তাহ যায়। মাস পেরিয়ে যায় ⏳।
বাস আসে, বাস যায়। চোখে চোখ পড়ে না, কিন্তু বুকের ভেতর জমে ওঠে এক অদ্ভুত বোঝাপড়া—যার নাম কেউ দেয়নি।
একদিন হঠাৎ ভিন্ন কিছু ঘটে।
বাসে ওঠার সময় মেয়েটার হাত থেকে একটা ছোট কাগজ পড়ে যায়। সে খেয়াল করে না। বাতাসে উড়তে উড়তে কাগজটা এসে ছেলেটার পায়ের কাছে থামে।
ছেলেটা প্রথমে তুলতে চায় না। মনে হয়—যদি না তুলি?
কিন্তু বুকের ভেতরের কৌতূহল তাকে হার মানায়।
সে কাগজটা তোলে। কাঁপা হাতে খুলে পড়ে।
লেখা আছে—
“আমি জানি, তুমি রোজ তাকাও… কিন্তু আমি চোখে চোখ পড়াতে পারি না।
যদি তুমি একদিন চোখ সরিয়ে নাও, তবে আমি হারিয়ে ফেলবো তোমায়।”
ছেলেটার চারপাশের শব্দ হঠাৎ থেমে যায়। বাসের হর্ন, মানুষের চিৎকার—সবকিছু যেন দূরে সরে যায়। শুধু নিজের হৃদস্পন্দনটা সে শুনতে পায় 💔।
এই প্রথম সে নিশ্চিত হয়—সে একা ছিল না।
সেদিন রাতে ঘুম আসেনি। বারবার সেই লাইনের কথা মনে পড়েছে।
“আমি চোখে চোখ পড়াতে পারি না।”
কেন পারে না?
ভয়?
সাহসের অভাব?
নাকি সে-ও ঠিক তার মতোই কিছু হারানোর ভয়ে চুপ করে ছিল?
পরদিন ছেলেটা সিদ্ধান্ত নেয়—আজ আর শুধু দাঁড়িয়ে থাকবে না। আজ সে বাসে উঠবে। আজ চোখে চোখ পড়বেই।
বাস আসে। দরজা খুলে যায়।
ছেলেটা দৌড়ে ওঠে। ভিড় ঠেলে সামনে যায়। জানালার দিকে তাকায়।
কিন্তু…
মেয়েটা নেই।
এক সিট থেকে আরেক সিট। পুরো বাস। কোথাও সে নেই।
ছেলেটার বুকটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়।
সে নামে। চারপাশে তাকায়। বাসস্ট্যান্ড। রাস্তা। ভিড়।
কিন্তু সেই পরিচিত মুখ নেই।
সেদিনের পর আর কোনোদিন মেয়েটাকে দেখা যায়নি।
সে আর সেই বাসে ওঠেনি।
কোথায় গেল, কেন গেল—কেউ জানে না।
কিন্তু ছেলেটা আসে।
প্রতিদিন।
একই সময়ে।
একই জায়গায়।
এখন সে আর তাকিয়ে থাকে না কোনো বাসের দিকে। তবুও দাঁড়িয়ে থাকে।
হয়তো অভ্যাস।
হয়তো অনুশোচনা।
হয়তো আশা—যে আশা সে নিজেও জানে, আর কোনোদিন সত্যি হবে না।
কখনো কখনো তার মনে হয়, হয়তো অন্য কোনো বাসে, অন্য কোনো জানালার পাশে বসে মেয়েটা এখনো তাকিয়ে থাকে।
কিন্তু এই পথে আর তাদের চোখে চোখ পড়ে না।
এই গল্পের কোনো শেষ নেই।
কারণ এখানে কেউ কাউকে হারায়নি, তবুও দু’জন দু’জনকে হারিয়ে ফেলেছে।
চোখে চোখ পড়েনি বলেই, কিছু অনুভূতি আজও নীরবই রয়ে গেছে।
