কিছু গল্প কেবল কল্পনা নয়—সেগুলো আমাদের চারপাশে নীরবে ঘটে যাওয়া বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আমরা ব্যস্ততা, জেদ আর অহংকারে অনেক সময় বুঝতেই পারি না—একটা অবহেলা, একটা না ধরা ফোন, একটা বলা না হওয়া কথা কত বড় মূল্য নিয়ে আসে। ভালোবাসা সব সময় বড় বড় প্রতিশ্রুতি চায় না; কখনো কখনো শুধু সময়মতো সাড়া পেলেই সে বেঁচে থাকে।
“যে কল আর আসবে না” এমনই এক গল্প—যেখানে একটি না ধরা কল বদলে দেয় পুরো জীবন। এটি অনুতাপের গল্প, অপেক্ষার গল্প, আর সেইসব অনুভূতির গল্প—যেগুলো শব্দে বলা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। এই গল্প পড়তে পড়তে হয়তো আপনিও থমকে যাবেন এক মুহূর্ত, নিজের জীবনের কোনো না ধরা কলের কথা মনে পড়ে যাবে… 💔
গল্পের নাম:যে কল আর আসবে না| 💔
নাম তার,রাকিফ, সে থাকে শহরের এক পুরনো চারতলা বাসার শেষ ফ্ল্যাটে।
দিনে সে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করে—নামমাত্র চাকরি, কিন্তু ভেতরে জমে থাকা ক্লান্তির কোনো নাম নেই। রাত নামলেই সে জানালার ধারে বসে পড়ে। কারণ জানালার ওপাশে বৃষ্টি হলে, তার মনে হয়—কেউ একজন এখনো তাকে মনে করছে।
মেহনা ছিল সেই মানুষটা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় পরিচয়। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, তারপর নির্ভরতা, তারপর ভালোবাসা।
ছয় বছরের সম্পর্ক—ছোট ছোট ঝগড়া, না বলা অভিমান, আবার রাত জেগে ফোনে কথা বলা।
মেহনা প্রায়ই বলত,
“তুই কথা না বললে আমার দম আটকে আসে রাকিফ।”
রাকিফ হেসে উড়িয়ে দিত।
সে ভাবত—ভালোবাসা তো আছেই, এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে?
কিন্তু ভালোবাসা সব সময় জেদের ভার নিতে পারে না।
সেদিনের ঝগড়াটা বড় ছিল না।
একটা ভুল বোঝাবুঝি, একটু রাগ, একটু ইগো।
মেহনা কাঁপা গলায় বলেছিল—
“আমি ক্লান্ত রাকিফ… সবসময় আমিই কেন বোঝাবুঝি করবো?”
রাকিফ রাগের মাথায় বলেছিল—
“তোর মতো মানুষকে আর দরকার নেই।”
এই কথাটা বলেই সে ফোন কেটে দিয়েছিল।
ভাবেনি—এই কথার ওজন কতটা ভারী হতে পারে।
রাত তখন ১টা ৪৭ মিনিট।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে—টুপটাপ, টুপটাপ।
রাকিফ জানালার ধারে বসে ছিল, সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে নিজের চিন্তা মিশিয়ে দিচ্ছিল।
হঠাৎ ফোনটা কেঁপে উঠলো।
স্ক্রিনে ভেসে উঠলো—
“মেহনা ❤️”
রাকিফের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।
তিন দিন পর ফোন। এই গভীর রাতে।
তার আঙুল স্ক্রিনের ওপর থমকে গেল।
মাথার ভেতর একটাই কথা—
“এবার একটু জেদ দেখাই… বুঝুক কষ্ট কাকে বলে।”
ফোনটা বাজতেই থাকল।
একটা… দুটো… তিনটা রিং।
তারপর কল কেটে গেল।
দুই মিনিট পর একটা মেসেজ এল—
“ভালো থাকিস রাকিফ।
আমি থাকব না।
এই শেষ কল ছিল।”
রাকিফ হেসে ফেলেছিল।
ভেবেছিল—নাটক করছে।
মনে মনে বলেছিল—
“আরো একবার কল করবি… তখন ধরব।”
কিন্তু ফোন আর বাজলো না।
সকালটা অস্বাভাবিক নীরব ছিল।
রাকিফ ঘুম থেকে উঠে ফোনটা হাতে নিল।
কোনো মিসড কল নেই।
হঠাৎ নিউজে চোখ পড়লো—
“এলাকার খালের ধারে এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধার…”
ছবিটা পুরো দেখা গেল না।
কিন্তু একটা লাল ওড়না…
একটা পরিচিত ঘড়ি…
রাকিফের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।
হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সে বোঝে গেল—
যে কলটা সে ধরেনি,
সেটাই ছিল শেষ আর্তনাদ।
মেহনা আর নেই।
সেই দিনের পর থেকে রাকিফের সময় থেমে গেছে।
তার ঘড়ি এখনো ১টা ৪৭ মিনিটেই দাঁড়িয়ে।
আয়নার সামনে দাঁড়ালেও সে নিজেকে চিনতে পারে না।
চুল এলোমেলো, চোখের নিচে কালো দাগ।
বন্ধুরা বলে—
“ভাই, জীবন থেমে থাকে না।”
কিন্তু রাকিফ জানে—
কারো কারো জীবন থেমে যায়,
শুধু শরীরটা বেঁচে থাকে।
বৃষ্টি হলেই সে জানালার পাশে বসে।
ফোনটা হাতে নিয়ে সেই নাম্বারে কল দেয়—
বিপ… বিপ… বিপ…
কেউ ধরে না।
একদিন মেহনার ডায়েরিটা তার হাতে আসে।
শেষ পাতায় লেখা—
“ভালোবাসা মানেই জেদ নয়,
ভালোবাসা মানে সময়মতো সাড়া।
কেউ যদি শেষবার ডাক দেয়—
তাকে অবহেলা কোরো না।”
রাকিফের বুকের ভেতরটা ফেটে যায়।
সে বুঝে যায়—
একটা কল, একটা কথা, একটু যত্ন
একটা জীবন বাঁচাতে পারত।
কিন্তু সময় আর ফেরে না।
আজও সে প্রতিজ্ঞা করে—
কখনো আর কাউকে অবহেলা করবে না।
কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা শোনার মানুষটা আর নেই।
কিছু কল মিস করা যায় না।
কারণ কিছু কল… সত্যিই আর আসে না। 💔
