কিছু ভালোবাসা শেষ হয় ঝগড়ায় নয়, শেষ হয় বলা না-পাওয়া কথায়। কিছু বিদায় আসে হঠাৎ—যেখানে ক্ষমা চাওয়ার সময় থাকে না, শেষবার ডাক দেওয়ার সুযোগও থাকে না। ঠিক এমনই এক অসম্পূর্ণ ভালোবাসার গল্প “অপূর্ণ বিদায়”।
এই গল্প আমাদের নিয়ে যায় এমন এক মুহূর্তে, যেখানে একটি ফোনকল শুধু একটি কল নয়—বরং হয়ে ওঠে জীবনের শেষ সংযোগ। সময়, দূরত্ব আর অভিমান মিলে তৈরি করে এমন এক নীরবতা, যা আর কোনোদিন ভাঙে না। ভালোবাসা থেকে যায়, কিন্তু মানুষটি চলে যায় চিরতরে।
“অপূর্ণ বিদায়” সেইসব হৃদয়ের গল্প বলে, যারা আজও অপেক্ষা করে—একটি শেষ ডাকের, একটি শেষ কথার, যা আর কখনো বলা হয়নি। 🖤
গল্পের নাম: অপূর্ণ বিধায় 🖤
শুভর বয়স তখন সাতাশ। ঢাকার উপকণ্ঠে একটি ছোট ভাড়া বাসায় একা থাকে সে। দিনের বেলা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি, আর সন্ধ্যাগুলো কাটে ক্লান্তি আর নীরবতার মধ্যে। শুভ খুব বেশি কথা বলা মানুষ নয়। কাজ শেষে বাসায় ফিরে চা বানায়, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শহরের আলো দেখে। সেই আলোয় তার চোখ বারবার খুঁজে ফেরে একজনকেই—আশিকে।
আশি ছিল শুভর জীবনের সবচেয়ে চেনা নাম, সবচেয়ে গভীর অভ্যাস। আশির পুরো নাম আশিকা রহমান। কলেজে পড়ার সময় থেকেই তারা একসঙ্গে। ছয় বছরের সম্পর্ক—যেখানে ভালোবাসা ছিল, ঝগড়া ছিল, আবার সব ভুলে একসঙ্গে হাসার অভ্যাসও ছিল 💕।
আশি থাকত শহরের অন্য প্রান্তে, পরিবারের সঙ্গে। পড়াশোনার পাশাপাশি একটি ছোট অনলাইন কাজ করত। স্বভাবটা ছিল একটু জেদি, কিন্তু মনের ভেতর অসম্ভব নরম। শুভ জানত, আশি রাগ করলে মুখ শক্ত করে রাখে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে খুব সহজেই ভেঙে পড়ে।
তাদের সম্পর্কের শুরুটা ছিল খুব সাধারণ। কলেজের লাইব্রেরিতে প্রথম কথা, তারপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, আর একদিন রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে শুভ বলেছিল— “তুই কি জানিস, তারা দেখলে আমার তোকে মনে পড়ে?” আশি হেসে বলেছিল— “বাজে কথা বলিস না।” কিন্তু সেদিনই আশির চোখে প্রথম লজ্জা আর ভালোবাসার আলো দেখা গিয়েছিল 🌌।
ছয় বছরে তারা একসঙ্গে অনেক কিছু ভাগ করেছে। পরীক্ষার চাপ, চাকরির দুশ্চিন্তা, পরিবারের সমস্যা। কখনো রাত জেগে ছাদে বসে আকাশ দেখেছে, কখনো ফোনের ওপাশে নিঃশব্দে কেঁদেছে। ছোট ছোট ঝগড়া হতো—কখনো দেরি করে ফোন দেওয়া নিয়ে, কখনো দেখা করতে না পারা নিয়ে। কিন্তু প্রতিবারই শুভ জানত, শেষটা হবে আশির হাসিতে।
তবে সব ঝগড়া একরকম হয় না।
দুই সপ্তাহ আগে একটা বড় ঝগড়া হয়েছিল। সেদিন শুভ অফিসের কাজে আটকে পড়ে দেরি করে আসে। আশি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিল। ফোনে রাগ জমে উঠেছিল তার গলায়। “সবসময় কাজ, কাজ আর কাজ! আমার জন্য কি একটু সময় নেই?” শুভ বোঝাতে চেয়েছিল, কিন্তু আশির রাগ তখন আর শোনার মতো ছিল না। একসময় আশি বলেই ফেলেছিল— “তোর সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। আর ফোন দিবি না।”
শুভ চুপ করে গিয়েছিল। ছয় বছরে এই প্রথম আশি এমন কথা বলেছে। শুভ জানত, এই কথার পেছনে রাগ আছে, অভিমান আছে—ভালোবাসা হারিয়ে যায়নি। সে ভেবেছিল, একটু সময় দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাই সে আর জোর করেনি। ভেবেছিল—কাল, না হয় পরশু, আশি নিজেই ফোন দেবে।
কিন্তু সময় সব সময় সুযোগ দেয় না।
সেই রাত। ঘড়িতে তখন ১টা ৫০ মিনিট। শুভ ঘুমোতে পারছিল না। বারবার মনে পড়ছিল আশির মুখ, তার রাগী চোখ, ভেজা গলা। ফোনটা হাতে নিয়ে বহুবার নাম্বার ডায়াল করেও কেটে দিয়েছে। মনে হয়েছে—আর একটু অপেক্ষা করি।
হঠাৎ ফোনটা কেঁপে উঠল 📱। স্ক্রিনে ভেসে উঠল—আশি।
শুভ যেন বিশ্বাসই করতে পারল না। তড়িঘড়ি করে ফোন ধরল— “আশি? কী বলবি?”
ওপাশে কোনো কথা নেই। শুধু হালকা নিঃশ্বাসের শব্দ। যেন কেউ কাঁদছে, কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না। শুভ বারবার ডাকতে লাগল— “আশি, আমি আছি… রাগ করো না। কথা বল।”
নীরবতা। সেই নীরবতার ভেতরে যেন চাপা কষ্টের ঢেউ। হঠাৎ কল কেটে গেল।
শুভ কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো, হয়তো নেটওয়ার্ক সমস্যা। হয়তো আশি কিছু বলতে চেয়েও পারেনি। সে নিজেকে বুঝাল—সকাল হলেই সব ঠিক হবে। সকালে ফোন করবে, রাগ ভাঙাবে, ক্ষমা চাইবে।
কিন্তু সকাল আরেক রকম খবর নিয়ে এলো।
ভোরে এক অচেনা নাম্বার থেকে কল এল। ওপাশের কণ্ঠ কাঁপছিল— “আপনি কি শুভ?” “জি…” “রাতে ১টা ৫০ মিনিটে আশিকার একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। হাসপাতালে আনার আগেই…”
বাকিটা শুভ আর শুনতে পায়নি। চারপাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। ফোনটা হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল। মাথার ভেতর শুধু একটা সময়ই ঘুরছিল—১টা ৫০ মিনিট 🕯️।
যে সময়ে আশি ফোন করেছিল। যে সময়ে শুভ বলেছিল—“আমি আছি।”
হাসপাতালের করিডরে শুভ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। সাদা চাদরের নিচে আশির মুখটা খুব শান্ত লাগছিল। যেন ঘুমিয়ে আছে। শুভ তার ঠান্ডা হাত ধরে ফিসফিস করে বলেছিল— “রাগ করিস না আশি… আমি তো ছিলাম।”
কিন্তু আশি আর শোনেনি।
তারপর থেকে শুভর সময় থেমে গেছে। দিন যায়, রাত আসে, কিন্তু ১টা ৫০ মিনিটে সবকিছু আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে। প্রতিদিন ঠিক সেই সময়ে শুভ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকে। মনে হয়—এই বুঝি আশির নাম ভেসে উঠবে।
কখনো ফোন বাজে না। কখনো আলো জ্বলে না।
তবুও শুভ অপেক্ষা করে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায় 🌑। তার মনে হয়, আশি কোথাও আছে—তার নিঃশ্বাসের শব্দে, সেই অপূর্ণ কথার ভেতরে।
শুভ জানে, কিছু বিদায় কখনো সম্পূর্ণ হয় না। কিছু ভালোবাসা শেষ কথাটা বলার সুযোগ পায় না। 🖤
আর সেই অপূর্ণতার ভেতরেই কোনো কোনো মানুষ সারাজীবন বেঁচে থাকে—নীরবে, গভীরভাবে, ব্যথার সঙ্গে।
