কিছু গল্প পড়তে হয় চোখ দিয়ে,আর কিছু গল্প পড়তে হয় হৃদয় দিয়ে। “ছোট রায়হানের চিঠি” ঠিক তেমনই একটি গল্প—
যেখানে নেই বড় কোনো ঘটনা,কিন্তু আছে এক শিশুর গভীর কষ্ট, মায়ের জন্য তীব্র আকুতি
আর নিঃশব্দ বিশ্বাস। এই গল্পটি মা হারানো একটি শিশুর দৃষ্টিতে লেখা—
যে জানে, মায়ের অভাব শুধু খাবার বা পোশাকের নয়,মায়ের অভাব মানে জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা।
গল্পের নাম: ছোট রায়হানের চিঠি।💌
একটি ছোট্ট গ্রাম ছিলো—নামটা খুব বেশি কেউ মনে রাখে না, কিন্তু গ্রামের প্রতিটা সকাল আর সন্ধ্যার মধ্যে লুকিয়ে থাকত মানুষের দুঃখ আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম। কাঁচা রাস্তা, মাটির ঘর, আর দূরে বয়ে যাওয়া একটুখানি নদী—এই ছিল গ্রামের চেনা ছবি। সেই গ্রামের এক প্রান্তে, টিনের চালা দেওয়া ছোট্ট একটা ঘরে থাকত রায়হান।
রায়হানের বয়স মাত্র আট বছর। চোখ দুটো বড় বড়, যেন সবকিছু অবাক হয়ে দেখে। কিন্তু সেই চোখের ভেতরে ছিল এমন এক শূন্যতা, যা অনেক বড় মানুষের চোখেও থাকে না। রায়হান সব সময় মাকে নিয়ে কথা বলত। গ্রামের মানুষ প্রায়ই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করত,
“তোর মা কোথায় রে?”
রায়হান তখন একটু চুপ করে থাকত। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলত,
“ওখানে।”
আসলে রায়হানের মা আর এই পৃথিবীতে নেই। ছোট্টবেলায়, যখন সে ঠিক করে কথা বলতেও শেখেনি, তখনই মাকে হারিয়েছিল। মায়ের মুখটা তার মনে ঠিক স্পষ্ট নেই, তবুও মনে হয়—মা ছিল খুব সুন্দর, খুব মায়াময়।
রায়হানের বাবা একজন দিনমজুর। সকালে বেরিয়ে যান, কখনো মাঠে কাজ, কখনো ইট ভাঙা, কখনো কারো বাড়ির ভারী বোঝা টানা। কাজ থাকলে ভাত জোটে, না থাকলে অনেক রাত কেটে যায় আধপেটে। এত কষ্টের মধ্যেও তিনি ছেলেকে খুব ভালোবাসেন, কিন্তু অভাবের কাছে অনেক সময় ভালোবাসাও নীরব হয়ে যায়।
এই অভাবের কারণেই রায়হান স্কুলে যেতে পারে না। তার হাতে বই নেই, খাতা নেই, ইউনিফর্ম নেই। স্কুলের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অন্য বাচ্চাদের হাসি আর চিৎকার দেখে। কেউ ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দৌড়াচ্ছে, কেউ মায়ের হাত ধরে যাচ্ছে। তখন রায়হানের বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। 💔
দিনের বেলা রায়হান খেলাধুলা করে। কখনো নদীর ধারে যায়, কখনো বাবার সঙ্গে মাঠে বসে থাকে। কিন্তু রাত নামলেই তার মনটা অন্যরকম হয়ে যায়। গ্রামের সব আলো নিভে গেলে, চাঁদ উঠলে, সে একা উঠোনে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। 🌌
তার মনে হয়, নক্ষত্রগুলোর ভেতর থেকে কেউ একজন তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সেই হাসিটা মায়ের মতো।
“মা…” — সে খুব আস্তে ডাকে।
গ্রামের মানুষরা রায়হানকে খুব আদর করে। কেউ কলা দেয়, কেউ বিস্কুট দেয়, কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
“কাঁদিস না বাবা, তোর মা তোকে উপর থেকেই দেখছে।”
কিন্তু এই কথাগুলো রায়হানের বুকের ভেতরের শূন্যতা ভরতে পারে না। সে বুঝে গেছে—মায়ের অভাব শুধু ভাত-কাপড়ের নয়। মায়ের অভাব মানে রাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার কেউ নেই, অসুখ হলে বুকের কাছে টেনে নেওয়ার কেউ নেই, আর সবচেয়ে বড় কথা—“মা” বলে ডাকবার কেউ নেই। 😔
একদিন বিকেলে পাড়ার এক বন্ধুর সঙ্গে নদীর ধারে বসে ছিল রায়হান। নদীর জল তখন শান্ত, সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে আকাশটা লালচে। হঠাৎ রায়হান খুব সরল একটা প্রশ্ন করে ফেলল—
“আচ্ছা, চিঠি লিখলে কি আকাশে মায়ের কাছে যায়?”
বন্ধুটি একটু ভেবে বলল,
“হয়তো যায়… যদি মন থেকে লিখিস।”
এই কথাটা রায়হানের মনে গেঁথে গেল। সেদিন সারারাত সে ঘুমাতে পারল না। মাথার ভেতর শুধু একটাই কথা ঘুরছিল—চিঠি।
পরদিন সকালে সে বাবার ফেলে রাখা একটা পুরোনো কাগজ খুঁজে পেল। পেন ছিল না, পাশের বাড়ির কাকিমার কাছ থেকে একটা আধভাঙা পেন্সিল নিয়ে এলো। সন্ধ্যা নামতেই সে ঘরের এক কোণে বসে পড়ল। 🌙
কাঁপা হাতে সে লিখতে শুরু করল—
“মা,
তুমি কেমন আছো?
আমি ভালো নেই মা। আমার খুব একা লাগে। সবাই মা ডাকে, আমিও ডাকতে চাই। তুমি কি একবার আসবে? আমি শুধু তোমাকে জড়িয়ে ধরতে চাই।
— তোমার ছেলে, রায়হান।”
লিখতে লিখতে তার চোখ ভিজে গেল। কাগজে পানির দাগ পড়ল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, বুকের ভেতর কেমন একটা হালকা শান্তি নামল। যেন অনেকদিনের জমে থাকা কথাগুলো কাউকে বলা হয়ে গেছে। 💌
সে বিশ্বাস করল—মা এই চিঠি পাবে।
রাত গভীর হলে, চাঁদের আলো নদীর পানিতে পড়লে, রায়হান কাগজটা ভাঁজ করে একটা ছোট নৌকা বানাল। তারপর খুব সাবধানে নদীর জলে ভাসিয়ে দিল। 🌊
নৌকাটা ধীরে ধীরে ভেসে যেতে লাগল। চাঁদের আলোয় নদীর জল ঝলমল করছিল। রায়হান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ল।
“মা… চিঠিটা পেয়ো।”
নৌকাটা দূরে মিলিয়ে গেল। রায়হানের চোখে তখনও জল, কিন্তু ঠোঁটের কোণে ছিল একটুখানি হাসি। 😊
সেই রাতের পর থেকে রায়হান বদলে গেল। সে এখনো কষ্ট পায়, এখনো একা লাগে, কিন্তু তার মনে বিশ্বাস জন্মেছে—মা তাকে ভুলে যায়নি। আকাশের তারাগুলো এখন আর শুধু আলো নয়, সেগুলো তার কাছে মায়ের চোখ।
প্রতিদিন রাত হলে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
“মা, আজ আমি ভালো ছিলাম।”
গ্রামের মানুষ জানে না, সেই ছোট্ট চিঠিটা কোথায় গেছে। হয়তো নদীর স্রোতে ভেসে হারিয়ে গেছে। হয়তো কোথাও কাদায় আটকে আছে।
কিন্তু রায়হানের বিশ্বাস—
মা সেই চিঠি পেয়েছে।
আর সেই বিশ্বাসই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। 🌟
