সমাজে সবাই সমান চোখে দেখা হয় না। কারো নামের আগে যোগ হয় বাবার পরিচয়, আর সেই পরিচয় যদি হয় দারিদ্র্যের, তাহলে মানুষটা অনেক সময় মানুষই থাকে না—একটা বোঝা হয়ে যায়। ভালোবাসা, সম্মান, সুযোগ—সবকিছুর দরজায় তখন যেন তালা ঝুলে যায়।
এই গল্পটি ঠিক তেমনই এক ছেলের জীবনকথা, যে কোনো অপরাধ না করেও শাস্তি পেয়েছে শুধু “গরিব বাবার ছেলে” হওয়ার কারণে। নীরব কষ্ট, চাপা কান্না, সমাজের অবহেলা আর বাবার নিঃশব্দ ভালোবাসার ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এক বাস্তবসম্মত যাত্রার গল্প এটি। এই গল্প শুধু চোখ ভেজায় না, মনকে প্রশ্ন করতে শেখায়—দারিদ্র্য কি সত্যিই ভালোবাসার অযোগ্য করে তোলে?
গল্পের নাম:বাবার ছায়ায়...!😅
শহরের এক কোণায়, যেখানে আলো পৌঁছাতে গিয়েও থেমে যায়, সেখানে একটা পুরোনো কলোনি আছে। নাম নেই, পরিচয় নেই—লোকজন শুধু বলে, “ওই গরিবদের এলাকা।” সেই এলাকার এক চিলতে ঘরে থাকত ইমরান আর তার বাবা আজিজ আলী।
আজিজ আলী মানুষটা নীরব। খুব বেশি কথা বলেন না। ভোরের আজানের আগেই বেরিয়ে যান, রাতে ফিরেন ক্লান্ত শরীর নিয়ে। কখনো নির্মাণ শ্রমিক, কখনো দিনমজুর, কখনো কিছুই না।
হাতে কাজ থাকলে খায়, না থাকলে চা-ভাতেই দিন কাটে। তবুও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি কোনোদিন বলেননি—“আমি পারছি না।”
ইমরান ছোট থেকেই বুঝে গিয়েছিল, দারিদ্র্য শুধু অভাব নয়—এটা অপমানও।
স্কুলে তার ইউনিফর্মটা অন্যদের মতো সাদা ছিল না। ধোয়া হলেও একটা পুরোনো ছাপ থেকে যেত। জুতার তলা ফেটে ছিলো, সে কাদার মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেলে ভেতরে পানি ঢুকে যেত। ক্লাসে বসে সে মনোযোগ দিয়ে পড়ত, কিন্তু আশপাশের হাসি-ফিসফিস তার কানে ঢুকতই।
“ওর বাবাটা কি করে জানিস?”
“কাজ করে… মানে যেটা পায়।”
“ওহ, তাই তো!”
এই “ওহ” শব্দটার ভেতরেই সব বলা হয়ে যেত।
ইমরান খুব মেধাবী ছিল। পরীক্ষায় ভালো ফল করত। কিন্তু ভালো ফলও সব সময় সম্মান এনে দেয় না—যখন তোমার জামা পুরোনো আর বাবার পরিচয় গরিব। শিক্ষকরা তাকে পছন্দ করতেন, কিন্তু সহপাঠীরা দূরত্ব রাখত। কেউ তার পাশে বসতে চাইত না।
একদিন স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ঘোষণা হলো। সবাই নিজের নাম দিচ্ছে—নাচ, গান, আবৃত্তি। ইমরানও হাত তুলেছিল। সে কবিতা লিখত, মনে মনে ভাবল—একটা কবিতা পড়বে।
কিন্তু তালিকা বের হওয়ার দিন তার নাম ছিল না। সাহস করে শিক্ষকের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
“স্যার, আমি নাম দিয়েছিলাম…”
শিক্ষক একটু অস্বস্তি নিয়ে বলেছিলেন,
“দেখো ইমরান, অনুষ্ঠানটা একটু স্ট্যান্ডার্ড রাখতে চাই। তাছাড়া… এসবের খরচও তো আছে।”
ইমরান বুঝে গিয়েছিল। কোনো প্রশ্ন আর করেনি। শুধু মাথা নিচু করে চলে এসেছিল।
সেদিন রাতে ঘরে ফিরে বাবাকে কিছু বলেনি। আজিজ আলী বুঝতে পেরেছিলেন ছেলের মন খারাপ। জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“কি রে, কিছু হয়েছে?”
ইমরান হেসে বলেছিল,
“না বাবা, এমনিই।”
কিন্তু রাতে বাবাকে ঘুমিয়ে পড়ার পর, ইমরান চুপচাপ কান্না করেছিল। শব্দ না করে, যেন কেউ শুনতে না
পায়। কারণ সে জানত—তার কান্নারও দাম নেই।
সময়ের সাথে সাথে ইমরান আরও চুপচাপ হয়ে গেল। বন্ধু কমে গেল, কথা কমে গেল। সে শুধু পড়াশোনায় ডুবে থাকত। বই ছিল তার আশ্রয়, শব্দগুলো ছিল তার বন্ধু।
কলেজে উঠে সে নতুন মানুষ পেল। বড় শহর, বড় স্বপ্ন। কিন্তু বাস্তবতা একই। ক্লাসে সবাই স্মার্ট ফোন নিয়ে ব্যস্ত, সে তখন পুরোনো একটা ফোনে নোট লিখে। কেউ তাকে ডাকত না, কেউ তার দিকে তাকিয়েও কথা বলত না।
একদিন ক্লাসের একটা মেয়ে—নাম তার নাবিলা—গ্রুপ প্রেজেন্টেশনের জন্য তাকে ডাকল। ইমরান প্রথমে
অবাক হয়েছিল। ভেবেছিল, কেউ হয়তো ঠাট্টা করছে। কিন্তু নাবিলার চোখে কোনো উপহাস ছিল না।
ওরা একসাথে কাজ করল। ইমরান খুব মন দিয়ে কাজ করল। প্রেজেন্টেশনটা সেরা হলো। সবাই প্রশংসা করল। সেদিন প্রথমবার ইমরান অনুভব করল—হয়তো সে অদৃশ্য না।
কিন্তু এই ভালো লাগাটা বেশিদিন থাকেনি।
একদিন কলেজের বাইরে কয়েকজন ছেলেকে সে কথা বলতে শুনেছিল—
“নাবিলা কেন ওর সাথে মিশে?”
“ও তো গরিব বাবার ছেলে!”
এই কথাটা তার বুকের ভেতর গেঁথে গেল। সে ধীরে ধীরে নাবিলার থেকে দূরে সরে গেল। নাবিলা বুঝতে পারেনি কেন। জিজ্ঞেস করেছিল,
“আমি কি কিছু ভুল করেছি?”
ইমরান শুধু বলেছিল,
“না, আমি ঠিক না।”
সে জানত—তার দারিদ্র্যই তার সবচেয়ে বড় অপরাধ।
এই সময় আজিজ আলী অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কাজ করতে পারতেন না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেল। ইমরান পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি শুরু করল, রাতের বেলা একটা দোকানে কাজ নিল।
একদিন রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সে দেখল—তার বাবা একটা বেঞ্চে বসে আছে। চোখে পানি।
“বাবা, তুমি বাইরে কেন?”
আজিজ আলী কাঁপা গলায় বললেন,
“দোকানদার আজ আর বাকি দেবে না বলল। তোকে কষ্ট দিতে মন চাইল না।”
ইমরান কিছু বলতে পারেনি। শুধু বাবার হাত ধরে বসেছিল। সেই রাতে সে প্রথমবার অনুভব করল—ভালোবাসা মানে বড় বাড়ি নয়, ভালোবাসা মানে পাশে থাকা।
বছর কেটে গেল। ইমরান কঠোর পরিশ্রম করল। স্কলারশিপ পেল, পড়াশোনা শেষ করল। একটা ভালো চাকরি পেল। শহরের উঁচু বিল্ডিংয়ে অফিস, পরিচ্ছন্ন পোশাক, সম্মান।
একদিন অফিসের এক মিটিংয়ে কেউ তার বাবার কথা জানতে চাইল। ইমরান হাসি মুখে বলেছিল,
“আমার বাবা একজন শ্রমিক।”
ঘরে ফিরে সে বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেছিল। আজিজ আলীর চোখ ভিজে গিয়েছিল।
সমাজ হয়তো একসময় তাকে ভালোবাসেনি। মানুষ তাকে অবহেলা করেছিল। কিন্তু সে শিখে গেছে—
ভালোবাসা ভিক্ষা করে নিতে নেই। নিজের মূল্য নিজেকেই তৈরি করতে হয়।
গরিব বাবার ছেলে ছিল বলেই সে শক্ত হয়েছিল। একা ছিল বলেই সে নিজের ভেতর আলো জ্বালাতে শিখেছিল।
