সব ছেলে খারাপ হয় না, আবার সব ভালো ছেলের জীবনও সহজ হয় না।
কিছু ছেলে জন্মায় অভাবের ভেতর, বড় হয় বাবার ঘামে ভেজা জামার গন্ধে। তাদের শৈশব খেলনায় নয়, হিসেব কষায় কাটে—আজ কীভাবে চলবে, কাল কীভাবে বাঁচবে।
এই গল্প সেই ছেলের—
যে বাবার ভাঙা হাতে স্বপ্ন দেখেছে,ঘরের অভাবকে লজ্জা নয়, শক্তি বানিয়েছে,আর হাজার ডাকের মাঝেও খারাপ রাস্তা বেছে নেয়নি।
এই গল্প কল্পনার নয়,
এ গল্প আশপাশে থাকা হাজারো রিফাতের—যারা নীরবে লড়ে,চুপচাপ সহ্য করে,
আর মানুষ হয়ে থাকার চেষ্টা করে।
“খারাপ রাস্তার মোড় থেকে ফেরা ছেলে”
একটি জীবনের গল্প—যেখানে হার মানে না নৈতিকতা,
জিতে যায় বাবার পরিশ্রম।
গল্পের নাম:সৎ থাকার দাম।❤️🩹
গ্রামের নামটা খুব সাধারণ—চরবাঁশখালি। নদীর ধারে, কাঁচা রাস্তা, বর্ষায় হাঁটু পানি, শীতে ফাটল ধরা মাটির গন্ধ। এই গ্রামেই জন্ম রিফাত হোসেনের।
রিফাত এখন ঢাকায় থাকে। শহরের একেবারে শেষ মাথায়, রেললাইনের পাশে একটা টিনের ঘরে। চারপাশে মানুষের ভিড়, কিন্তু কারো চোখে চোখ রাখার সময় নেই। সকালে ঘুম ভাঙে ট্রেনের বিকট শব্দে, রাতে ঘুম আসে ক্লান্ত শরীরের ভারে।
সে কাজ করে একটি প্রিন্টিং প্রেসে। কালি, কাগজ আর ঘামের গন্ধে তার দিন কাটে। হাতে কালো দাগ লেগে থাকে সারাদিন। মাস শেষে বেতন পায় সামান্যই, কিন্তু সেই সামান্য দিয়েই চলে তার পুরো সংসার।
সংসার বলতে—বাবা।
হাশেম আলী। বয়স এখন ষাট পেরিয়েছে। এক সময় গ্রামের সবচেয়ে পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। সূর্য ওঠার আগেই বের হতেন, সূর্য ডোবার পর ফিরতেন। হাত দুটো শক্ত ছিল, পিঠ ছিল সোজা। এখন সেই হাত কাঁপে, পিঠ নুয়ে গেছে।
রিফাত যখন ছোট, তখন তারা থাকত একটা মাটির ঘরে। ঘরের চাল দিয়ে বৃষ্টি পড়ত। রাতে মা হাঁড়ি পাতত চালের নিচে, যাতে পানি জমে। মা বলতেন,
“দেখিস রিফাত, একদিন এই ঘর ছাড়বো।”
মা সেই একদিনটা দেখে যেতে পারেননি।
রিফাতের বয়স তখন দশ। জ্বরে ভুগতে ভুগতে মা এক রাতে চুপ করে গেলেন। ঘরে তখন বাতি ছিল না, শুধু একটা কুপির আলো। বাবা মায়ের নিথর শরীর ধরে বসে ছিলেন। রিফাত কোণে বসে শুধু তাকিয়ে ছিল। কান্না আসছিল না। বুকটা ভারী হয়ে ছিল, কিন্তু চোখ শুকনো।
সেদিনই রিফাত বড় হয়ে গিয়েছিল।
এরপর থেকে বাবার কাঁধে সংসার, আর রিফাতের কাঁধে বাবার স্বপ্ন।
স্কুলে রিফাত ভালো ছাত্র ছিল। শিক্ষকরা বলতেন, “ছেলেটা পড়াশোনা করলে অনেক দূর যাবে।” কিন্তু দূরে যাওয়ার পথে টাকা লাগে, আর টাকা তাদের ছিল না।
ক্লাস এইটের পরই স্কুল ছাড়তে হয় রিফাতকে। বাবা একদিন সন্ধ্যায় ভাঙা কণ্ঠে বলেছিলেন,
“বাবা, আর পারতেছি না। তুই যদি একটু কাজ করতিস…”
রিফাত কিছু বলেনি। শুধু মাথা নেড়েছিল।
সেই মাথা নেড়েই তার জীবন ঘুরে গেল।
ঢাকায় আসে সে এক মামার হাত ধরে। প্রথম কাজ পায় একটি ওয়ার্কশপে। লোহা কাটে, ভারী জিনিস তোলে। হাতে ফোসকা পড়ে, রাতে ঘুম আসে না। কিন্তু সে অভিযোগ করে না।
কারণ তার মনে পড়ে বাবার কথা—
“বাপের পরিশ্রম আর ঘরের অভাব যে ছেলে দেখেছে, সে খারাপ রাস্তায় যায় না।”
এই কথাটা রিফাত বুকের ভেতর পাথরের মতো বয়ে বেড়ায়।
কিন্তু শহর নিষ্ঠুর। শহর সুযোগ দেয়, আবার টানেও। ওয়ার্কশপের পাশেই কিছু ছেলেপেলে থাকে। তারা রাত হলে সিগারেট খায়, গাঁজা টানে, টাকা কামানোর সহজ রাস্তা দেখায়।
একদিন একজন বলল,
“এইভাবে খাটিস কেন? এক রাতেই যা কামাই করিস, তোর মাসের বেতনের চেয়ে বেশি।”
রিফাত চুপ ছিল।
আরেকদিন আরেকজন বলল,
“ভাই, আমরা তো খারাপ না। শুধু সুযোগ নিচ্ছি।”
সেই রাতে রিফাত ঘুমাতে পারেনি। বাবার মুখ চোখের সামনে ভাসছিল। মায়ের শেষ রাতের চুপচাপ মুখটা মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, এক পা ভুল পড়লে আর ফিরে আসা যাবে না।
পরদিন সে ওয়ার্কশপের কাজ ছেড়ে দেয়।
অনেক দিন কাজ পায় না। সকালে বের হয়, সন্ধ্যায় ফিরে আসে খালি হাতে। একদিন ফোনে বাবার কণ্ঠ শুনে বুকটা ফেটে যায়। বাবা বলছিলেন,
“আমি ভালো আছি বাবা। তুই চিন্তা করিস না।”
রিফাত জানত, বাবা ভালো নেই।
শেষমেশ প্রিন্টিং প্রেসে কাজ পায়। কম বেতন, কিন্তু সৎ কাজ। সে নিজেকে ধরে রাখে। ধীরে ধীরে কাজ শেখে। মালিক একদিন বলে,
“তুই ভালো ছেলে। ঠিক থাকিস।”
এই “ভালো ছেলে” কথাটা রিফাত অনেক দিন শুনেনি।
দিন যায়। বাবাকে শহরে নিয়ে আসে সে। বস্তির ঘর ছোট, কিন্তু নিজের। রাতে বাবা ঘুমালে রিফাত তাকিয়ে থাকে তার দিকে। ভাবতে থাকে—এই মানুষটা কত কষ্ট করেছে তার জন্য।
একদিন রাতে বাবা হঠাৎ বলে ওঠেন,
“রিফাত, তুই যদি কখনো খারাপ পথে যেতিস, আমি বাঁচতাম না।”
রিফাত চোখ নামিয়ে বলে,
“আমি জানি আব্বা। আমি জানি।”
তার চোখে পানি আসে, কিন্তু সে কাঁদে না।
আজ রিফাত বড়লোক না। তার বাড়ি পাকা না। তার হাতে দামি ঘড়ি নেই। কিন্তু তার বুকের ভেতর এক ধরনের শান্তি আছে।
সে জানে—সে বাবার পরিশ্রমকে অপমান করেনি।
সে জানে—ঘরের অভাব তাকে ভাঙতে পারেনি।
সে জানে—খারাপ রাস্তা তাকে ডাকলেও, সে ফিরে এসেছে।
রাতে ট্রেনের শব্দের মাঝেও সে ঘুমাতে পারে।
কারণ তার বিবেক জাগে না, শুধু ক্লান্ত শরীর বিশ্রাম নেয়।
এই শহরের ভিড়ে, এই অভাবের মাঝেও—রিফাত হোসেন একজন মানুষ হয়ে বেঁচে আছে।
