ভালোবাসা সবসময় পাওয়া যায় না—এই কথাটা আমরা অনেকেই জানি, কিন্তু যারা সত্যিই একতরফা ভালোবাসার আগুনে পুড়ে বেঁচে থাকে, তারাই বোঝে সেই ব্যথার গভীরতা। কখনো পাওয়া হবে না জেনেও কারও প্রতি অদ্ভুত টান, অকারণ মায়া, তার হাসিতে আনন্দ পাওয়া আর তার চোখের পানি দেখলে বুকের ভিতর অদ্ভুত ভাঙন—এই অনুভূতিগুলোই হয়তো ভালোবাসার সবচেয়ে নিখুঁত রূপ।
এই গল্পটিও ঠিক তেমনই এক অনুভূতির যাত্রা।
এখানে আছে এমন একজন মানুষের কাহিনি, যে তার প্রিয় মানুষকে কখনো নিজের করতে পারবে না জানত, তবুও সে তাকে নিজের হৃদয়ের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় রেখে দিয়েছে।
ভালোবাসা কখনো কখনো দূরত্ব মেনে নেয়,
কখনো চুপচাপ অপেক্ষা করে,
আবার কখনো স্রেফ মায়ার ওপর ভর করে বেঁচে থাকে।
অপূর্ণ ভালোবাসা, নিঃশব্দ যন্ত্রণা এবং হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া সেই মায়ার গল্প—
“যে ভালোবাসা ছুঁয়েও ছোঁয়া যায় না..”শুরু হচ্ছে এখান থেকেই।
গল্পের নাম:যে ভালোবাসা ছুঁয়েও ছোঁয়া যায় না।🥀
একটা ভোরবেলা। গ্রামের ছোট্ট রাস্তা ধরে ধুলো উড়ছে হালকা হাওয়ায়। রাফি মোটরবাইক ধীরে চালিয়ে যাচ্ছে স্কুলে পড়াতে। সে গ্রামেরই এক স্কুলের শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীদের মুখে হাসি ফোটানো আর তাদের স্বপ্ন দেখানো ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুখ।
কিন্তু তার নিজের জীবনে?
সেখানে যেন গল্প থমকে আছে কোনো এক জায়গায়—যেখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
হয়তো সে কারণেই তার ডেস্কের ডায়েরিতে প্রায়ই লেখা থাকে—
“কখনো পাওয়া হবে না… তারপরও তার প্রতি এত কেনো মায়া!”
এই এক লাইনেই লুকিয়ে আছে বহু বছরের জমা কষ্ট।
আর সেই কষ্টের নাম—মায়া।
মায়া কে? জানো।
ফিরে যেতে হবে ছয় বছর আগের সেই দিনে—
যেদিন প্রথম রাফি তাকে দেখে।
শহরের কলেজে ভর্তি হয়েছিল তারা দু’জনেই। প্রথমদিন ক্লাস করার পর বের হওয়ার সময় আচমকা বৃষ্টি নেমে গেল। তার ছাতা ছিল না। আর মায়ার হাতে ছিল ছোট্ট একটা ভেজা ছাতা, যেটা দুইজনের জায়গা নিতে লজ্জায় রাজি ছিল না।
রাফি বলেছিল,
“একটু শেয়ার করতে পারবেন? দূরে তো যাই না।”
মায়া হেসে ছাতা বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই হাসিটা রাফির বুকের কোথাও গেঁথে গিয়েছিল এমনভাবে, যেটা আজও বের করতে পারছে না।
সেদিনের পর থেকে তারা বন্ধু হলো।
বন্ধু থেকে খুব ভালো বন্ধু। আর খুব ভালো বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে অন্য কোনো অনুভূতিতে পরিণত হলো।
তবে সেই অনুভূতি ছিল একতরফা, একতরফা কিন্তু সমুদ্রের মতো গভীর।
মায়া জানত না…
যে তার হাসির পেছনে রাফির বুক কাঁপত, তার কাঁধে মাথা রেখে কান্না করলে রাফির দুনিয়া থেমে যেত,
আর তার প্রতিটি দুঃখ রাফি নিজের মধ্যে টানার চেষ্টা করত।
তবুও…
রাফি কখনো বলেনি।
কেন বলেনি?
কারণ রাফি বুঝেছিল, মায়া তাকে শুধু “ভালো বন্ধু” হিসেবেই দেখে।
বন্ধুত্বের সম্পর্কটা নষ্ট হওয়ার ভয়, হারিয়ে ফেলার ভয়, আর সবচেয়ে বেশি—
মায়ার সুখ হারানোর ভয়।
এই ভয়গুলো তাকে চুপ থাকতে শিখিয়েছে।
কিন্তু চুপ থাকা কি সবসময় ঠিক হয়? না।
চুপ থাকা কখনো কখনো মানুষকে ভেতরে ভেতরে ফাঁকা করে দেয়।
একদিন মায়ার জীবনে পরিবর্তন আসে—
মায়ার জীবনে প্রবেশ করল আরেকজন— রিজভী।
রাফি আগেই দেখেছিল ছেলেটা বেশ মিশুক, স্মার্ট, শহুরে স্টাইলের।
একদিন ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে মায়া হেসে বলেছিল,
“রিজভীকে কেমন লাগে তোমার? মানুষটা ভালো, তাই না?”
রাফির বুকের ভেতর কোথাও হেঁচকা টান লাগল। তবু সে হাসল, “হ্যাঁ, ভালোই তো।”
লোকটার প্রশংসা করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না।
এরপর থেকে রিজভী ও মায়াকে প্রায়ই একসঙ্গে দেখা যেত।
মায়ার চোখে নতুন আলো, নতুন উত্তেজনা।
আর রাফির চোখে? অদৃশ্য এক বেদনা, যেটা কেউ দেখে না।
একদিন হঠাৎ…
মায়া এসে বললো, “রাফি, আমার তোমাকে একটা কথা বলার আছে।”
রাফি জানত কি আসছে, তবু শান্ত মুখে বলল,
“বল।”
মায়া ফিসফিস করে বলল,
“আমি রিজভীকে পছন্দ করি… খুব। ও আমাকে প্রপোজ করেছে। আমি হয়তো রাজি হয়ে যাব। তুমি রাগ করবে না তো?”
রাফির মুখে হাসি ফুটল, চোখের ভেতরে ঝড় লুকিয়ে রেখে।
“তোমাকে খুশি দেখাটাই আমার কাছে বড় জিনিস।”
এই একটিমাত্র বাক্য বলে সে চুপ হয়ে গেল।
আর সেদিন রাতে সে ডায়েরিতে লিখল—
“কখনো পাওয়া হবে না… তারপরও তার প্রতি এত কেনো মায়া।”
সময় গড়াল।
রাফি চাকরি পেয়ে গ্রামে চলে গেল। মায়া শহরে থেকে গেল রিজভীর সঙ্গে।
দূরত্ব বাড়ল, কথা কমল…
ধীরে ধীরে মায়া যেন হারিয়েই গেল রাফির জীবন থেকে। কিন্তু রাফি এখনও তার সব স্মৃতি বুকে নিয়ে বেঁচে আছে। আবার কেন রাখে?
কারণ ভালোবাসা তো ঝাড়ার মতো নেই যে সরিয়ে ফেললেই মুছে যাবে। ভালোবাসা জমাট বাঁধে…
যতদিন বলা না হয়, ততদিন আরো শক্ত হয়।
কয়েক বছর পর—এক সন্ধ্যা
মোবাইল বেজে উঠল।
নাম দেখে রাফির বুক কেঁপে উঠল—মায়া কল করছে।
“হ্যালো…” রাফির কণ্ঠ থরথর করে উঠল।
ওপাশে নীরবতা। তারপর খুব পরিচিত কিন্তু ভাঙা কণ্ঠ—
“রাফি… আমি ভালো নেই।” রাফির বুক হিম হয়ে গেল।
“কী হয়েছে?”
মায়া কেঁদে ফেলল। “রিজভী… ও আমাকে প্রতারণা করেছে। অন্য কারো সঙ্গে…” কথা শেষ করতে পারল না সে। অন্য প্রান্ত থেকে শুধু কান্নার শব্দ আসতে লাগল।
রাফি কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। যে মেয়েকে সে এত ভালোবাসে, যার জন্য সে নিজের অনুভূতি চাপা দিয়ে গেছে তার সুখের জন্য— আজ সে মেয়েই ভেঙে পড়ছে।
রাফি ধীরে বলল,
“তুই কাঁদিস না মায়া… আমি আছি।”
মায়া বলল,
“তুই কেন এত ভালো রাফি? আমি তো তোর জীবনেও জায়গা করে দিইনি…”
এই কথায় রাফির বুকটা যেন ভেঙে গেল।
কিন্তু সে বলল,
“ভালোবাসা মানে জায়গা চাই না… ভালোবাসা মানে পাশে থাকা।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“তুই কি কখনো… আমাকে ভালোবাসতিস?” এই প্রশ্নে রাফি স্তব্ধ।
বুকের সব কথা যেন গাঢ় অন্ধকারে ডুবে থাকা পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“হ্যাঁ… আজও বাসি।” ওপাশ থেকে নরম কান্নার শব্দ—
“তুই আগে বললি না কেন?”
রাফি হাসল—কঠিন, বেদনা মাখা, ভাঙা হাসি।
“তুই সুখে ছিলি। আমি নষ্ট করতে চাইনি।” মায়া উত্তর দিল না। শুধু নিঃশব্দ কান্না।
তারপর ফোন কেটে গেল।
---
