জীবনে এমন অনেক কথা থাকে, যেগুলো আমরা ভুলে যাই। কিন্তু কিছু কিছু কথা এমনভাবে বুকের ভেতর লাগে, যেন সারাজীবনের জন্য দাগ ফেলে যায়। আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত কারও তুচ্ছ মন্তব্য কখনো কখনো আমাদের ভেতর শক্তি জাগিয়ে তোলে। এই গল্পটি তেমনই এক তরুণের, যে অপমানকে নিজের প্রেরণা বানিয়েছিল।
গল্পের নাম:আত্মীয়দের কথা।🩶
শুভর বয়স তখন বিশ বছর। ছোটবেলা থেকেই ওর একটা অভ্যাস ছিল—চুপচাপ থাকা। অন্যদের মতো বেশি কথা বলত না। সবাই ভাবত, ছেলেটা অহংকারী, নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকে। কিন্তু সত্যিটা ছিল অন্যরকম—শুভ আসলে অন্তর্মুখী, আর ভিতরে খুব সংবেদনশীল।
বাবা মারা গিয়েছিলেন অনেক আগেই। মা একাই সংসার চালাতেন। দারিদ্র্য যেন ওদের প্রতিদিনের সঙ্গী ছিল। কিন্তু মা কখনো হাল ছাড়েননি। সকালে অন্যের বাড়িতে কাজ করে, বিকেলে আবার নিজে হোম টিউশনি করতেন। শুভ মাকে দেখেই বুঝত, জীবন কত কঠিন হতে পারে, তবুও কেমন হাসিমুখে লড়াই করতে হয়।
কিন্তু আত্মীয়-স্বজনের চোখে শুভর পরিবারটা সবসময় “অসহায়” ছিলো।
যে বাড়িতে উৎসবে সবার মুখে আনন্দ, সেই বাড়িতেই তারা শুনত ব্যথা জাগানো কথা—
“তোমাদের এখনো কিছু হলো না?”,
“ছেলেটা কিছু করবে কবে?”,
“এমন ঘরে জন্মালে কিছুই হয় না।”
একটা একটা করে কথাগুলো যেন তীরের মতো এসে শুভর বুকের ভেতর বিঁধত।
বাইরে থেকে সে হাসার চেষ্টা করত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কাঁদত।
একবার ঈদের দিন সকালে মা তাকে নিয়ে মামার বাড়ি গিয়েছিল। সবাই জমায়েত, খাওয়া-দাওয়া চলছে। হঠাৎ এক আত্মীয় হেসে বলে উঠল,
“শুভ তো এখনো কিছুই করে না, তাই না? এত বড় ছেলে, কিছুই করতে পারল না! তোমার ছেলেকে দিয়ে কি হবে বোন?”
মা তখন হেসে কিছু বলেননি। কিন্তু শুভ দেখেছিল, মায়ের চোখের কোণে একটা জল চিকচিক করছে।
সেই মুহূর্তে শুভর বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল।
ওর মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তার মায়ের সম্মান নিয়ে খেলছে।
বাড়ি ফেরার পথে শুভ কিছুই বলেনি। শুধু চুপচাপ হাঁটছিল।
মা বলল, “মন খারাপ করিস না বাবা, মানুষ কথা বলবেই।”
শুভ শুধু মাথা নাড়ল। তারপর বললো,
“সব কথা মনে রাখি না মা, তবে যে কথা একবার বুকে এসে আঘাত লাগে, সে কথা কখনো ভুলি না।”
সেদিন থেকেই শুভ ঠিক করল, যেভাবেই হোক, কিছু একটা করবে—শুধু নিজের জন্য নয়, মায়ের জন্য।
পরের কয়েক বছর ছিল নিরব সংগ্রামের। দিনে কাজ, রাতে পড়াশোনা। কারও কাছে কিছু চায়নি, শুধু নিজেকে প্রমাণ করার জন্য কাজ করে গেছে।
বছর পাঁচেক পর, শুভ এখন একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। নিজের ঘরে মা আর সে—ছোট্ট সংসার, কিন্তু ভরপুর শান্তি।
একদিন সেই একই আত্মীয়দের একজন ফোন করে বললো,
“শুভ, শুনলাম তুই এখন ভালো জায়গায় কাজ করছিস? দারুণ! দেখিস, তোর মতো ছেলেরা একদিন অনেক দূর যাবে।”
ফোন রেখে শুভ মুচকি হাসল।
তার মনে পড়ে গেল সেই ঈদের দিন, সেই অপমান, সেই চোখের জল।
জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে বলল—
“হ্যাঁ, সব কথা মনে রাখি না… কিন্তু যে কথা একবার বুকে এসে আঘাত লাগে, সে কথা কোনোদিন ভোলা যায় না।”
বাতাসে যেন একরাশ নীরবতা ভেসে বেড়াচ্ছে।
কষ্টের সেই পুরনো কথাগুলো আজও মনে পড়ে, কিন্তু এখন সেগুলো আর ব্যথা দেয় না—বরং মনে করিয়ে দেয়, কে কীভাবে আচরণ করেছিল, আর সেই কথাগুলিই শুভকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।

গল্প থেকে শিক্ষা।
মানুষের বলা কিছু কথা মুহূর্তে ভুলে যাওয়া যায় না। অপমান, হেয় করা, অবমূল্যায়ন—এসবই কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। জীবনে এগিয়ে যেতে গেলে অন্যের কথায় ভেঙে পড়া নয়, বরং সেটাকেই নিজের শক্তিতে রূপান্তর করতে জানতে হয়।
আপনার মতামত দিন।
গল্পটা পড়ে আপনার কেমন লেগেছে? নিচে মন্তব্যে জানাতে পারেন।
আপনার মতামত আমাদের জন্য মূল্যবান।
👉 যদি গল্পটি ভালো লেগে থাকে, তাহলে ব্লগটি Follow করুন।
এখানে প্রতিদিন পাওয়া যাবে আরও সুন্দর ও অনুপ্রেরণামূলক গল্প, জীবন থেকে শেখার মতো কিছু কথা ও বাস্তব অনুভূতি। 🌿
আপনার ভালো লাগা আমাদের লেখার প্রেরণা।”