ভূমিকা"
মানুষের জীবনে অনেক সময় এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সব স্বপ্ন ভেঙে যায়, বিশ্বাস হারিয়ে যায় এবং মন ভরে ওঠে এক অদ্ভুত শূন্যতায়। তখন মনে হয় জীবন যেন অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেই কখনো কখনো এমন কিছু সত্য আমাদের সামনে আসে, যা আমাদের আবার নতুন করে বাঁচতে শেখায়। এই গল্পটি মেহেরা নামের এক তরুণীর জীবনের এমনই এক রহস্যময় রাতের গল্প—যেখানে অতীতের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া বন্ধুত্ব এবং জীবনের গভীর কষ্ট তাকে নতুনভাবে নিজের জীবনকে বুঝতে শেখায়।
গল্পের নাম:অচেনা দরজার ডাক ।🖤
নাম ছিলো তার মেহেরা।
মেহেরার বয়স ছিলো প্রায় ২৪ বছর। একসময় সে ছিলো হাসিখুশি, স্বপ্নে ভরা একটি মেয়ে। ছোট শহরের শান্ত পরিবেশে বড় হওয়া মেহেরার চোখে ছিলো অসংখ্য স্বপ্ন—একদিন বড় কিছু করবে, নিজের জীবন নিজের মতো করে সাজাবে, আর চারপাশের মানুষদের সুখী করবে।
কিন্তু জীবন সবসময় স্বপ্নের মতো হয় না।
কিছু বছর আগে মেহেরা শহরে গিয়েছিলো পড়াশোনা করতে। নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন সম্পর্ক—সবকিছু যেন তাকে এক অন্য জগতে নিয়ে গিয়েছিলো। প্রথম দিকে সবকিছু ভালোই চলছিলো। সে পড়াশোনায় ভালো করছিলো, নতুন বন্ধু পেয়েছিলো, ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় বড় পরিকল্পনা করছিলো।
কিন্তু ধীরে ধীরে জীবনের বাস্তবতা তার সামনে খুলে যেতে শুরু করলো।
বিশ্বাস ভেঙে গেলো, সম্পর্ক ভেঙে গেলো, আর সবচেয়ে বড় কথা—নিজের স্বপ্নগুলোও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে লাগলো। যে মানুষদের সে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছিলো, তারাই একসময় তাকে ছেড়ে চলে গেলো।
মেহেরা বুঝতে পারলো—শহরের আলো যত উজ্জ্বল, মানুষের মন ততটাই অন্ধকার হতে পারে।
একদিন সবকিছু ছেড়ে সে ফিরে এলো তার পুরনো বাড়িতে—সেই বাড়ি যেখানে তার শৈশব কেটেছিলো, যেখানে প্রতিটি দেয়ালে লুকিয়ে ছিলো পুরনো স্মৃতি।
সেই রাতটা ছিলো অদ্ভুত এক রাত।
রাত প্রায় ২টা…
চারপাশে গভীর নীরবতা।
আকাশে চাঁদ নেই, শুধু অন্ধকারে ঢাকা আকাশ। দূরের রাস্তার বাতির আলো হালকা করে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। বাতাসে ছিলো শীতলতা, যেন রাতটা নিজেই কোনো গোপন গল্প লুকিয়ে রেখেছে।
মেহেরা একা বসে ছিলো তার বাড়ির ছাদে।
তার চোখে ঘুম ছিলো না। মনে হচ্ছিলো তার বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টগুলো যেন তাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলো—জীবন কি সত্যিই এমন হওয়ার কথা ছিলো?
কখন যেন তার চোখে পানি চলে এলো।
ঠিক তখনই হঠাৎ একটি শব্দ ভেসে এলো।
কর্কশ একটা শব্দ…
যেন অনেক পুরনো কোনো দরজা ধীরে ধীরে খুলছে।
মেহেরা চমকে উঠলো।
এই বাড়ির ছাদের এক কোণায় একটি পুরনো কাঠের দরজা ছিলো। সেই দরজাটা অনেক বছর ধরেই বন্ধ ছিলো। কেউ কখনো সেটি ব্যবহার করতো না।
কিন্তু আজ—
দরজাটা নিজে থেকেই খুলে যাচ্ছে।
কাঠের দরজাটা কড়মড় শব্দ করে ধীরে ধীরে খুলতে লাগলো।
মেহেরার বুকের ভেতর ধড়ফড় করতে লাগলো।
সে তাকিয়ে রইল দরজার দিকে।
দরজার ফাঁক দিয়ে যেন কারো ছায়া দেখা গেলো।
একজন দাঁড়িয়ে আছে সেখানে।
মেহেরা চোখ বড় করে তাকিয়ে রইলো।
তার হৃদয় যেন থেমে গেলো এক মুহূর্তের জন্য।
কারণ সে যাকে দেখলো, সেই মুখটা তার খুব পরিচিত।
সে ছিলো—
রাহিম।
তার শৈশবের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
কিন্তু অসম্ভব!
রাহিম তো বহু বছর আগে মারা গিয়েছিলো।
একটি দুর্ঘটনায় সে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। সেই দিনটার কথা মনে পড়লেই মেহেরার বুক ভেঙে যেতো।
মেহেরা চিৎকার করতে চাইলো, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
রাহিম ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।
তার পায়ের কোনো শব্দ নেই।
শুধু ঠান্ডা বাতাস বইছে চারপাশে।
তার চোখ দুটো শান্ত, কিন্তু গভীর।
হঠাৎ রাহিমের কণ্ঠ ভেসে এলো—
“মেহেরা…”
কণ্ঠটা ছিলো পরিচিত, কিন্তু যেন অনেক দূর থেকে আসছে।
মেহেরার শরীর কাঁপতে লাগলো।
রাহিম আবার বললো—
“তুমি কি আমাকে ভুলে গেছো?”
মেহেরার চোখে জল চলে এলো।
সে ফিসফিস করে বলল—
“তুমি… তুমি তো আর বেঁচে নেই…”
রাহিম হালকা করে হাসলো।
তারপর ধীরে ধীরে বললো—
“মৃত্যু সবকিছুর শেষ নয়, মেহেরা… কিছু প্রতিশ্রুতি মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে।”
মেহেরার হঠাৎ মনে পড়লো তাদের শৈশবের একটা ঘটনা।
তারা দুজন এই ছাদেই বসে ছিলো একদিন।
সেদিন রাহিম মজা করে বলেছিলো—
“যদি আমি কখনো আর বাঁচতে না পারি… তুমি একদিন এই দরজা খুলে আমার জন্য অপেক্ষা করবে। আমি ফিরে আসব।”
মেহেরার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
রাহিম ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়ালো।
তারপর খুব শান্ত কণ্ঠে বললো—
“তুমি জানো মেহেরা… তুমি এমন এক জীবন বেছে নিয়েছো যেখানে তুমি শুধু নিজেকে বাঁচিয়েছো। কিন্তু তোমার ভেতরের আশা, স্বপ্ন, আর বন্ধুত্ব—সবকিছু মেরে ফেলেছো।”
এই কথা শুনে মেহেরার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো।
সে মাথা নিচু করে ফেললো।
কারণ সে জানতো—এই কথাগুলো সত্য।
জীবনের কষ্ট, বিশ্বাসঘাতকতা আর ব্যর্থতা তাকে এতটাই ভেঙে দিয়েছিলো যে সে নিজের স্বপ্নগুলোই ভুলে গিয়েছিলো।
রাহিম আবার বললো—
“তুমি জানো সবচেয়ে বড় কষ্ট কী?”
মেহেরা কাঁপা গলায় বলল—
“কি?”
রাহিম ধীরে ধীরে উত্তর দিলো—
“সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো… যখন তুমি জানো কেউ আর ফিরবে না, তবুও তুমি অপেক্ষা করে থাকো।”
এই কথাগুলো শুনে মেহেরার চোখে পানি ভরে গেলো।
ঠিক তখনই দরজাটা হঠাৎ পুরোপুরি খুলে গেলো।
একটা ঠান্ডা ঝড়ো বাতাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো।
মেহেরা অনুভব করলো—তার বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত কষ্ট যেন ধীরে ধীরে হালকা হয়ে যাচ্ছে।
যেন এতদিনের যন্ত্রণা বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।
রাহিম ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে লাগলো।
মেহেরা চিৎকার করে উঠলো—
“যেও না!”
কিন্তু রাহিম তখন প্রায় মিলিয়ে গেছে।
শেষবারের মতো তার কণ্ঠ ভেসে এলো—
“কষ্টকে কখনো ভয় পেও না, মেহেরা… কষ্টই একমাত্র জিনিস যা মানুষকে প্রমাণ করে—সে এখনও জীবিত।”
তারপর সবকিছু আবার শান্ত হয়ে গেলো।
রাত ধীরে ধীরে শেষ হলো।
সকাল হলো।
সূর্যের আলো ছাদের উপর পড়লো।
মেহেরা ছাদের এক কোণায় বসে আছে।
চারপাশে কেউ নেই।
পুরনো দরজাটা আবার বন্ধ।
কিন্তু আজ মেহেরার চোখে জল থাকলেও তার মুখে এক অদ্ভুত শান্তি।
কারণ সে বুঝে গেছে—
জীবনের কষ্ট শেষ নয়।
কষ্টই মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
আর কিছু দরজা থাকে—
![]() |
| 🥀 |
