এই গল্পটি গ্রামীণ জীবনের কষ্ট, মা হিসেবে রহিমার আত্মত্যাগ এবং মানবিকতার এক চিরন্তন দৃষ্টান্ত।
বেঁচে থাকার সংগ্রামে ছোট্ট ভাঙা চুলা, অল্প ভাত, আর অক্লান্ত চেষ্টা—সব মিলিয়ে দেখায়, সত্যিকারের শক্তি আসে ভালোবাসা ও দান থেকে।
“ভাঙা চুলার ধোঁয়া” গল্পটি আমাদের শেখায়, দান ও মানবতার শক্তি ক্ষুধার চেয়ে বড়।
গল্পের নাম:ভাঙা চুলার ধোঁয়া।।
বেলাইপাড়া—সতেরো বছরের পুরোনো ছোট্ট গ্রাম। ৭০-এর দশকের এক অচেনা সকাল। ভোরের আলো পুরোপুরি ওঠেনি, মেঘলা আকাশে সূর্যের আলো যেন লুকোচুরি খেলছে।
রহিমা বেগম ঘুম থেকে উঠে। চোখে ঘুম নেই, মুখে চিন্তার রেখা। ঘরের কোণে পড়ে আছে ভাঙা চুলা, যেখানে গত রাতে আর আগুন জ্বলেনি।
স্বামী হাশেম আলী মারা গেছে বছর খানেক হলো। রেখে গেছে তিনটি সন্তান আর পাহাড়সম দায়িত্ব।
ছোট ছেলে মায়ের কোলে এসে বলল,
“মা, আজ ভাত হবে?”
রহিমা কিছু না বলে মাথায় আঁচল টেনে নিল। ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল সকালবেলার কাজের খোঁজে।
গ্রামে ধান কাটার মৌসুম চলছে। রহিমা ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত অন্যের জমিতে ধান কেটে, গোছিয়ে, বেঁধে চলল। ঘাম গাল বেয়ে ঝরছে, কিন্তু চোখে আছে একটাই লক্ষ্য—আজ সন্তানদের মুখে একটু ভাত তুলে দিতে পারে।
দুপুরে মজুরি হিসেবে পেল আধা কেজি চাল আর এক মুঠো ডাল। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরে সে চুলায়
আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করল। ভাঙা চুলা, তবুও ধোঁয়া উঠল একটু একটু করে।
সন্তানরা হাসিমুখে বসে আছে হাঁড়ির পাশে—যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।
ঠিক তখন দরজায় কড়া পড়ল। এক বৃদ্ধ লোক, ছেঁড়া কাপড়ে মোড়া, চোখে ক্লান্তির ছাপ, বলল,
“বোন, তিন দিন হলো কিছু খাইনি… একটু ভাত দেবে?”
রহিমা থমকে দাঁড়াল। হাঁড়িতে ভাত কম, কিন্তু বৃদ্ধের চোখের ক্ষুধা তার নিজের ক্ষুধার চেয়ে গভীর।
সে হাঁড়ি থেকে অর্ধেক ভাত তুলে বৃদ্ধের থালায় দিল।
ছেলেমেয়েরা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল—
“মা, তাহলে আমরা কী খাবো?”
রহিমা মৃদু হাসল, বলল,
“তুমি অন্যের পেট ভরালে আল্লাহ আমাদের পেট ভরিয়ে দেবেন।”
বৃদ্ধ ভাত খেয়ে চোখে জল নিয়ে বলল,
“বোন, আল্লাহ তোমার ঘর ভরে রাখুক। আজ থেকে তুমিই আমার মেয়ে।”
রাত নামল। চাঁদের আলোয় সেই ভাঙা চুলা থেকে আর ধোঁয়া উঠছিল না, কিন্তু রহিমার মনে জ্বলছিল
এক অদৃশ্য আলো।
সন্তানরা ঘুমিয়ে পড়েছে, রহিমা ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবল—
“আজ নিজের পেট না ভরলেও অন্তত একটা প্রাণকে বাঁচাতে পেরেছি।”
পরদিন সকালে দরজার বাইরে শব্দ শুনে রহিমা বের হয়ে এল। দেখল, গত রাতের সেই বৃদ্ধ কিছু খাবার
আর চাল রেখে গেছে, সাথে একটি কাগজে লেখা—
“তুমি যে দান করেছ, তা আল্লাহর পথে লেখা হলো।”
রহিমার চোখে জল এসে গেল। সে হাঁড়ি ধুয়ে নতুন করে আগুন জ্বালাল। এবার ধোঁয়াটা ছিল ভিন্ন—এটা ক্ষুধার নয়, ছিল আশার ধোঁয়া।
![]() |
