জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন অন্ধকার যেন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। তখন অনেকেই ভুল পথে পা বাড়ায়, আবার কেউ কেউ নীরবে লড়াই করে আলো খুঁজে নেয়। এই গল্পটি ঠিক তেমনই এক কিশোরের—যে দারিদ্র্য, কষ্ট আর প্রলোভনের মাঝেও মায়ের শেখানো মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরে মানুষ হয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছে। “ছায়া থেকে আলো” আমাদের শেখায়, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, সৎ ইচ্ছা আর সঠিক সিদ্ধান্ত মানুষকে একদিন ঠিকই আলোয় পৌঁছে দেয়।
গল্পের নাম: ছায়া থেকে আলো। 🌟
রাতের নিস্তব্ধ শহর। স্ট্রিট লাইটের নিচে একা বসে আছে এক কিশোর—তার নাম কাব্য। গায়ে পুরনো ছেঁড়া জামা, হাতে একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ। ব্যাগের ভেতরে রয়েছে একটি চিঠি—তার মায়ের লেখা। 💌
এই চিঠিটাই এখন কাব্যের সবচেয়ে বড় সম্বল।
এক সময় কাব্য ছিল গ্রামের সেরা ছাত্র। শিক্ষকরা গর্ব করে বলতেন,
“এই ছেলেটা একদিন অনেক বড় হবে।”
কিন্তু হঠাৎ বাবার মৃত্যু আর মায়ের দীর্ঘ অসুস্থতা সবকিছু বদলে দিলো। সংসারে নেমে এলো অভাব, অনাহার আর অসহায়ত্ব।
পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল। ভাতের অভাবে একদিন ঘর ছাড়তে হলো কাব্যকে। মায়ের চোখের জল দেখে সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলো—
যে করেই হোক, সংসারের দায়িত্ব সে নেবেই।
শহরে এসে কাজ নিল এক ছোট রেস্তোরাঁয়।
দিনভর বাসন মাজা, মাল টানা, টিফিন বয়ে দেওয়া—কোনো কাজই সে এড়িয়ে যেত না। শরীর ক্লান্ত থাকত, কিন্তু মন ভাঙত না। প্রতিদিন কাজ শেষে সে মায়ের লেখা চিঠিটা পড়ে ঘুমাত।
চিঠিতে লেখা ছিল—
“বাবা, মানুষ হয়ে বাঁচিস। খারাপ পথে যাস না।”
একদিন এক লোক এসে কাব্যকে প্রলোভন দেখাল—
“এক রাতের ঝুঁকিতে পঞ্চাশ হাজার টাকা।”
কাব্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। লোভ হয়েছিল, কারণ টাকার অভাব তার জীবনের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল মায়ের মুখ, আর সেই চিঠির কথাগুলো।
সে দৃঢ়ভাবে না বলল। চুপচাপ সেখান থেকে চলে এলো।
হাঁটতে হাঁটতে সে এসে দাঁড়াল এক পুরনো লাইব্রেরির সামনে। দরজার ভেতর থেকে হালকা আলো বেরোচ্ছে। সাহস করে দরজায় টোকা দিল। 🚪
একজন বৃদ্ধ দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমি কে?”
কাব্য কাঁপা গলায় বলল,
“আমি চুরি করতে আসিনি, স্যার। আমি শুধু একটা সুযোগ চাই—কিছু শিখতে চাই।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন,
“যদি সত্যিই চেষ্টা করো, তবে আমি তোমাকে পথ দেখাবো।” 🌟
সেই দিন থেকেই কাব্যের জীবনের মোড় ঘুরে গেল।
দিনে সে রেস্তোরাঁয় কাজ করত, আর রাতে পড়াশোনা করত লাইব্রেরিতে। বৃদ্ধ শিক্ষক তাকে শুধু বইয়ের জ্ঞানই দেননি, শিখিয়েছিলেন জীবনকে বোঝার পাঠ। ধীরে ধীরে কাব্যের ভেতরে জ্বলে উঠল নতুন এক আলো। ☀️
বছর কেটে গেল।
একদিন সেই কাব্যই গড়ে তুলল নিজের একটি স্কুল। নাম রাখল—“আলো একাডেমি”।
সেখানে সে পড়াতে শুরু করল পথশিশুদের—যাদের জীবনে সুযোগ ছিল না, ছিল শুধু সংগ্রাম। সে তাদের শুধু পড়াত না, খাওয়াতও। কারণ ক্ষুধার কষ্ট সে নিজে অনুভব করেছে।
আজও তার ক্লাসরুমের দেয়ালে টাঙানো আছে সেই পুরনো চিঠিটি—মায়ের লেখা। ক্লান্ত হয়ে পড়লে সে পড়ে সেই লাইনগুলো—
“মানুষ হয়ে বাঁচিস, বাবা।”
এই কথাগুলোই আজ তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
আজ কাব্য সবার কাছে পরিচিত “কাব্য স্যার” নামে।
সে জানে—
![]() |
