এই শহর আর গ্রামের ভিড়ে কিছু মানুষ থাকে, যাদের জীবন কখনো খবরের শিরোনাম হয় না। তাদের কষ্ট নীরব, সংগ্রাম অদৃশ্য, আর আশা থাকে খুব ছোট্ট—তবুও গভীর। “শেষ ভরসা” ঠিক তেমনই এক সাধারণ মানুষের গল্প, যে জীবনের প্রতিটি ধাক্কা বুকে চেপে ধরে শুধু পরিবারের জন্য টিকে থাকতে চায়। কাজহীনতা, দারিদ্র্য আর অপমানের ভেতর দাঁড়িয়েও যে মানুষটি বিশ্বাস করে—ভরসা হারিয়ে গেলে সব শেষ। এই গল্প কোনো কল্পনার নয়, এ গল্প আমাদের চারপাশের হাজারো মুখের নীরব বাস্তবতা।
গল্পের নাম: শেষ ভরসা।🤍
আব্দুল করিম—গ্রামের সবাই যাকে ডাকে আব্দুল কাকা।
বয়স প্রায় বায়ান্ন বছর।
বাড়ি উত্তরবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রামে, যেখানে একসময় মাঠজুড়ে ধান দুলত 🌾, আর এখন ফাটল ধরা মাটিতে শুধু রোদ আর দীর্ঘশ্বাস পড়ে থাকে।
আব্দুল কাকা কখনো বড় মানুষ ছিলেন না। কোনো নামডাক, কোনো পরিচিতি—কিছুই ছিল না। ছিলেন শুধু একজন সাধারণ মানুষ, যিনি সারা জীবন পরিশ্রম করে গেছেন পরিবারটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। আগে নিজের একটু জমি ছিল। সেই জমিতেই চাষ করতেন, সংসার চলত কোনোমতে। কিন্তু কয়েক বছর টানা খরা, ঋণ আর অসুখ—সব মিলিয়ে জমিটুকুও হাতছাড়া হয়ে যায়।
সংসারে তখন শুধু তিনজন—তিনি, তার স্ত্রী আর একমাত্র ছেলে রাশেদ।
ছেলেটার বয়স তখন বারো। চোখে স্বপ্ন ছিল অনেক, কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো কেন যেন সবসময় ক্ষুধার পাশে বসে থাকত।
রাশেদ পড়াশোনায় ভালো ছিল। স্কুল থেকে ফিরে বাবাকে বলত,
“আব্বা, আমি বড় হয়ে শিক্ষক হব।”
এই কথাটা শুনে আব্দুল কাকার বুকটা ভরে উঠত। মনে হতো, জীবনের সব কষ্ট বুঝি এই এক লাইনে হালকা হয়ে যায়।
কিন্তু বাস্তবতা খুব নির্মম।
ঘরে চাল নেই, স্কুলের ফি বাকি, বই কেনার টাকা নেই। স্ত্রী অন্যের বাড়িতে কাজ করে যা পায়, তাতে দু’বেলা খাওয়া কোনোমতে চলে। আব্দুল কাকা দিনের পর দিন বসে থাকতে পারেননি। তার মনে হলো—এই গ্রামে থাকলে ছেলের ভবিষ্যৎটাই থেমে যাবে।
একদিন খুব ভোরে, ফজরের আজানের পর, তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—শহরে যাবেন।
কাজের খোঁজে।
যদি কিছু একটা পান, তাহলে সংসারটা আবার দাঁড় করানো যাবে।
তিনি একটা ভাঙাচোরা ব্যাগ বের করলেন ।🎒
ব্যাগে ঢুকালেন— দুটো পুরোনো জামা,
একজোড়া ছেঁড়া জুতা,
আর তিনদিনের শুকনো রুটি।
স্ত্রী দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। কিছু বলছিল না। যাওয়ার সময় শুধু বলল,
“কাজ না পেলেও ফিরে আসবেন… আপনি থাকলেই আমাদের ভরসা।”
এই কথাটুকু শুনে আব্দুল কাকা মাথা নিচু করে ফেললেন। চোখের পানি লুকিয়ে রেখে শুধু বললেন,
“ফিরবই।”
শহরে পৌঁছে প্রথম কয়েকদিন তার মনে আশা ছিল। বড় শহর—মানুষ অনেক, কাজও নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু দুই দিন, তিন দিন, এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেল—কাজ মিলল না। যেখানে যান, সেখানেই এক কথা,
“লোক লাগবে না।”
পেটের ভেতর ক্ষুধা চিৎকার করত, কিন্তু মুখ কিছু বলত না।
কখনো গ্যারেজে ঝাড়ু দিতেন, কখনো চায়ের দোকানে বাসন মাজতেন। কোনো কোনো দিন কাজ জুটতই না। তখন ফুটপাতে বসে রুটি ভিজিয়ে খেতেন। রাতে শোবার জায়গা পেতেন না—কখনো মসজিদের বারান্দা, কখনো দোকানের ছাউনি 🌙।
রাতে শুয়ে চোখ বন্ধ করলেই গ্রামের ছবিগুলো ভেসে উঠত।
ছেলের মুখ, স্ত্রীর ক্লান্ত হাসি, কাঁচা ঘরের চাল।
এই ছবিগুলোই তাকে পরের দিন আবার উঠে দাঁড়াতে বাধ্য করত।
একদিন দুপুরে কাজ খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ মাথা ঘুরে বসে পড়লেন। শরীর আর নিতে পারছিল না। পাশ দিয়ে মানুষ গেছে, কেউ থামেনি। তখন তার মনে হলো—এই শহরে মানুষ নয়, শুধু নিজের নিজের বাঁচার যুদ্ধ।
সবচেয়ে ভেঙে পড়লেন যেদিন গ্রামের একজন চিঠি এনে দিল।
চিঠিতে লেখা—রাশেদের স্কুলের নাম কাটা গেছে। ফি না দেওয়ায় আর ক্লাসে বসতে দিচ্ছে না।
চিঠিটা হাতে নিয়ে তিনি অনেকক্ষণ বসে ছিলেন। চোখে পানি এসেছিল, কিন্তু কাঁদেননি। কিছু কষ্ট আছে, যেগুলো কান্নারও সুযোগ দেয় না 💔।
সেই রাতেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—ফিরবেন।
খালি হাতে হলেও ফিরবেন।
কারণ শহর তাকে কাজ দেয়নি, কিন্তু মানুষের মতো থাকতে দেয়নি।
ভোরের আলো ফুটতেই সেই পুরোনো ব্যাগটা কাঁধে নিলেন। ছেঁড়া জুতা পায়ে দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলেন। প্রতিটা পা ফেলতে কষ্ট হচ্ছিল, তবুও মনে একটা অদ্ভুত শান্তি ছিল। তিনি জানতেন—পরিবারের কাছে ফিরছেন।
গ্রামে পৌঁছানোর দিন রাশেদ দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল।
স্ত্রী কিছু বলল না, শুধু চোখের পানি মুছল।
ঘরে টাকা নেই, কাজ নেই—কিন্তু মানুষগুলো একসাথে আছে।
পরদিন থেকেই আব্দুল কাকা আবার লড়াই শুরু করলেন। গ্রামের লোকের জমিতে দিনমজুরি, কখনো ইট টানা, কখনো কাঠ কাটা। অল্প আয়, কিন্তু মনটা হালকা। ধীরে ধীরে স্কুলের বকেয়া দিলেন। রাশেদ আবার বই হাতে নিল 📚।
এক রাতে ছেলে বলল,
“আব্বা, তুমি শহর থেকে কিছু আনোনি?”
আব্দুল কাকা হেসে বললেন,
“আনছি তো… ভরসা।”
এই ভরসাই ছিল তার জীবনের শেষ সম্বল।
টাকা আসবে যাবে, কাজ থাকবে না থাকবে—কিন্তু ভরসা থাকলে মানুষ ভেঙে পড়ে না 🌱।
আব্দুল কাকার জীবন বড় কোনো সাফল্যের গল্প নয়।
কিন্তু এটা টিকে থাকার গল্প।
মানুষ হয়ে থাকার গল্প।
আর সবচেয়ে বড় কথা—হাল না ছাড়ার গল্প।
![]() |
